​
তাকে শুধু রোদ বলি

আকাশে আকাশে আজ উদাম ফুটছে সুমাত্রার রোদ

মাথার পেছনে সূর্যের ধারালো ছায়া শুধু দীর্ঘ হয়;

জলের দোকান থেকে পিছলে আসছে মানুষের হল্লা,

বনের ভেতরে আমি শিকারীর বেশে তবু বর্ষা খুঁজি-

ঘন মরীচিকা চরাচরে ছেয়ে গেছে; যেন দুটো জুন

ভাঁজ করে রাখা আছে বাতাসে বাতাসে; ধবধবে সাদা

আরবি ঘোড়ার কাছে অবিরাম কাঁপে হলুদ ফলেরা,

যেন তাদের শরীর গাঢ় হয়ে গেছে উষর বাতাসে-

তবু শিকারির বেশে মহুয়ার ফুলে আমি রোদ দেখি;

মাথা দোলানো বনফুলেরা নুয়ে পড়ে সমূহ বাতাসে,

যেন তাদের কাছেই কোজাগরী রাত মৃদু হেলে আছে

কিংবা পাখিদের নিবিড় বাড়িতে দেখি কিছু উৎসব;

তাদের করোটির ভেতর যেন পৃথিবীর সব রঙ

জ্বলজ্বলে অভ্যাসে নিকানো আছে বিকেলের মতো।


একা হলে অকারণে

হে সুদীর্ঘ রাত্রি ঘন, জলো অন্ধকার

আবার আমাকে খোলো, খুঁজে দ্যাখো সব,

আমার অরূপ দেহ, নীরবতা মোহ,

ছেনে দ্যাখো সবখানে মাথার গহিনে,

মধুর চাকের মতো সূর্যমুখী যত

হেলে আছে ঢেউতোলা স্রোতের ভেতরে;

যত অতলতা রাতের আঁধার হয়ে

চোখের জানালা ভেঙে ঢুকে গেছে ধীরে;

তাদের নিকটে দ্যাখো পিপাসা তারিয়ে

শুয়ে আছি অবিরাম ভাষাহীন স্বরে-

কী-বা হবে শুধু ভেবে মাস্তুলের পরে

কেন চাঁদ লেগে থাকে শরত-নরমে;

কেন শুধু একা হলে পরিযায়ী লাগে

কী-বা হবে শুধু শুধু অকারণ ভেবে-



মনে তবু মধু রাখা হলে

মাটি খুঁড়ে বিষণ্ণতা পুঁতে রেখে তবু যারা

পথ করে রাত-ভোরে সব ঘন জল ভেঙে

সব পোড়া মুখ ভুলে নিজেকেই পুঁজি করে

সাবয়ব হাসি রেখে অবিরাম যায় হেঁটে-

চারপাশে জমে থাকা মানুষের অবহেলা

আর মরুভূমিবোধ কিংবা অজানিত ক্রোধ

সরিয়ে নিপুণ হাতে মনে তবু মধু রেখে

বিপাশা নদীর দিকে উড়ে গেছে যারা ধীরে-


একদিন আচম্বিতে তারা দূরে চলে গেলে

মানুষের অনিদ্রায় ডহরেরা দেখা দেয়,

লোকদের করোটিতে যেন তারা বসে থাকে

অনায়াসে জানু পেতে অথবা ললিতাসনে-

পৃথিবীর সবখানে কোনো এক অনুমানে

সব তিরোহিত স্নেহ মৃদু হাত রাখে যেন-



পাখি যারা পৃথিবীর

যদি কোনো মধ্যরাতে; কাকজোছনায়,

নির্জন পথের ধারে পাতার ভেতরে

অবিরাম ক্রীড়ারত জলজ বাতাসে

ডোডোপাখির মরণ ঘনীভূত হয়-

কিংবা জোছনাজড়িত বা অমাবস্যার

কোনো এক গরমের আন্তরিক রাতে

কোনো এক সুবাসিত ফলের খামারে

কোনো এক হরিয়াল বারবার কাঁদে-


সেই হাওয়ার রাতে পাখিদের সব

বলকানো ব্যথা আর বিষাদ গহিন

ফুটে ওঠে পৃথিবীর সব আফসোসে-

যেন তারা জগতের আদি অবয়ব

আর ভাষার ভেতরে কোনো অন্তহীন

স্বর লুকিয়ে রেখেছে সমূহ বিস্তারে-



কী আছে অথবা নেই

গহিন পথের দেহে জমানো পাথরগুলো

মনে হয় যদি মৃত অথবা ধূসর জলো;

যদি গাছের পাতায় নদীর জলের কালো

গাঢ় কোনো আঁচ রাখে আর দৃশ্যের শরীরে

কোনো এক অকারণে সৌদামনী রাত আনে;

কিংবা যদি পেরুবার সব উদাম প্রবেশে

কুয়াশা পিছলে যায় ক্রমশ ক্ষয়ের দিকে,

বা করোটিতে এসব কেবলই অবিদিত


নিঃসঙ্গ মাথার কাছে কাঁপে শুধু বিচলিত
-

আত্মকরুণার দিকে তবুও অনঙ্গ কোনো

ঘন ছায়ায় নিকানো সমুদ্রের ঢেউয়েরা

সাদা বুকের ভেতর ছোটো ছোটো ঘোরলাগা

বর্ষার নরম ছাঁট সাময়িক রাখে আর

হাওয়ায় হাওয়ায় একক পিপাসা আনে-

​

সান্ধ্যসনেট

থির গুঁজে থাকা কোনো এক স্তব্ধতায়

অরূপ যা কিছু মাথার ভেতরে ঘোরে,

যেসব সংকেত বসন্ত দিনের মতো

বোধের উত্তাপে অনুপম ঘ্রাণ রাখে

আর শ্রাবণকালের মেঘদের মতো

কাত হয়ে নুয়ে ক্রমাগত শব্দ করে,

অথচ তাদের ভাষা গাঢ় সন্ধ্যা যেন,

কেবলই খুলে পড়ে হাতের পিছনে-


এরপর ভুলে অথবা আক্রান্ত হয়ে
,

জোছনাজড়িত আবছায়া অনুমানে

পর্যটনের আনন্দ চারপাশে রেখে

নতুন কবির মতো অবিরাম ঝুঁকে

সারা গায়ে কোনো উতলা শ্বাস নিকিয়ে

কাব্য মুকুরিত করি সনেট শরীরে-



দুঃখ যদি ক্রীড়া করে

যখনই কোনো দুঃখ আসে আকস্মিক,

সারা দেহ ঘিরে করোটির চারপাশে

যখনই হৃদয়ের ডহরে ডহরে

করুণ জলের দেহ অনায়াসে কাঁপে,

কিংবা আয়ুর অসীমে কী এক বিরান

সব দ্বিধা ফেলে রেখে সমূহ বিস্তারে

নিদ্রাহীন ক্রীড়া করে আর প্রকাশিত

ফুলের কাছেই আফসোস খুলে পড়ে,

মাথার ভেতরে জমে থাকা আন্তরিক

সুবাসিত সব আলো, অরূপ রোশনি

জলের বিন্যাসে অবিরাম কেঁপে কেঁপে

অ্যাবসার্ড হয়ে পড়ে; যেন কিছু নেই

নিজের ছায়ার চারপাশে বিজড়িত,

ধূসর রাত্রি কেবল আকর্ণবিস্তৃত!



গরমকালের সন্ধ্যারাতে

আকাশে নিকিয়ে থাকা সব ঘন আলো

কমে আসার ভেতর উড়ে যাচ্ছে সব

ভরপেট সারসেরা; প্রান্তরের দেহে

পড়ে আসা রোদে মানুষের যাতায়াত

অনুমিত হয়; যেন তারাও ফিরছে

নিজ হাতে গড়ে রাখা উষ্ণতার কাছে,

কমলা রঙের পাশে অবিরাম কাঁপে

শীতলষষ্ঠী দিনের অনুগামী চাঁদ-


এরপর আকাশের বুক খুলে ধীরে

বের হয়ে আসা অনুপম হাওয়ারা

পৃথিবীর সব তামারঙা লোকদের

দেহের ভেতর দিয়ে উড়ে যায় আর

গাছদের সরু পাতাগুলো ঘিরে শুধু

শব্দ হয় যেন রাত্রি এবার নামবে-



আলাদা আহ্নিকে আলাদা কুহক

দিনভর রাতভর সমূহ বর্ষার পায়ে নিভু নিভু কেঁপে

পাতাদের ফাঁকে ফাঁকে সাদা-কালো মিনা করা ঘন সারিবাঁধা

ক্রমশ সরে যাওয়া ডাগর শামুকদের গাঢ় নির্জনতা

গভীর দেখেছে যারা, অথবা বর্ষার জাঁকালো ভ্রান্তিতে নুয়ে

সে সব কিছু না দেখে বর্ষাতি ব্যতীত সব জলো সীমারেখা

দ্রুত পার হয়ে যারা হেঁটে গেছে অগোছালো পথের ভেতরে

কিংবা অনেক সহজে দোটানায় পড়ে সব ফণা নত করে

ফিরে ফিরে আসে যারা খসখসে রোদ আর গাছের ছায়ায়-


তারা কিংবা পথিকেরা
, পৃথিবীর সব পর্যটক মানুষেরা

জলকাটা জুতো খুলে বর্ষার মাথার পাশে নগ্ন পায়ে যদি

পরিযায়ী হেঁটে যায় উদাম সন্ধ্যের কোনো ভাঙা অনুপলে-

আচমকা কিংবা ধীরে ভিজে যায় শরীরের সবগুলো নখ

আর মিহি পশমেরা; তবুও কুহক থাকে সবার আহ্নিকে

ভারী জলে কেউ ভাসে, কেউ শুধু কাঁপে মৃদু ঝরা সান্ধ্য জলে-



যারা হাঁটে বীবরের পথে

ঘন রোদ ভরা কম্বুরেখ পথ ধরে

ক্রমাগত যারা বাতাসের দেহ ভেঙে

অচেনা আভাসে আস্থা রেখে অতি ধীরে,

নরম মেজাজে সব কোলাহল ছেড়ে

মহাসন্ধ্যা কিংবা তারও অনেক পরে

মাধবী অথবা তারাফোটা অন্ধকারে

শুধু হেঁটে গেছে; যারা অবসাদ ভুলে

কেবল হেঁটেছে বীবরের পথ ধরে-


তারাই শুনেছে শুধু শব্দ দূরবর্তী
,

কিংবা পাতায় পাতায় জড়ানো বাতাসে

কোনো এক বিকেলের অনুপম স্মৃতি,

অথবা কখনো কোনো ফেলে রাখা ছায়া

আর ভোরের পিছনে জড়ো করে রাখা

সূর্যের অমেয় নাভি দেখেছে কিছুটা-

***