পানি বাড়তে থাকে
সে-রাতে মা খুব কাঁদছিল। বাবার সঙ্গে শুয়ে আছি। ঘুম আসছে না। বাবা মা-র সঙ্গে শুতে দিচ্ছে না। কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়ি জানি না। ঘুম ভাঙলে দেখি পুতুলের মতো একটা বাবু মা-র পাশে হাত-পা নাড়ছে। কোথা থেকে এলো মা-কে জিজ্ঞেস করলে মা বলে, বাবা মেলা থেকে এনেছে। সে-রাতের পর থেকে জীবন্ত পুতুলটিকে ভাই বলে জানি। বাবা সকালে ঘর থেকে বের হন আর ফেরেন রাতে। তখন আমাদের একজোড়া কবুতর ছিল। কবুতর দু’টি শহরে আমাদের মতো নতুন। বাবা তাদের ডানা বেঁধে দিয়েছে। সেদিন সকাল থেকেই খুব বৃষ্টি। বৃষ্টিতে কবুতর দম্পতি খোপে না-ঢুকে আমগাছের ডালে আশ্রয় নেয়। অন্ধকার নামতেই ঝড় তুফান বেড়ে যায়। মা গল্প ব’লে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ঘুমের ভেতর চোখ খুলে দেখি পাখির পালকের মতো ঘরের চাল উড়ে গেছে। আকাশে বোমারু বিমানের মতো বজ্রপাত। আশ্রয় পাই বাড়িওলার ঘরে। পানি বাড়তে থাকে। আমার মা আর বৃদ্ধ বাড়িওলা প্রথমে খাটের উপর তারপর টেবিলের উপর। পানি বাড়তে থাকে। খাটের উপর টেবিল, টেবিলের উপর চেয়ার, চেয়ারের উপর বৃদ্ধ আর আমার মা। মা-র কোলে আমার নবজাতক ভাই। এ বাড়ির সবাই আশ্রয় নেয় বাড়িওলার ঘরে। পানি আরও বাড়লে আমরা সিলিং-এ উঠি। বৃদ্ধ এবং আমার পোয়াতি মা-ও ওঠে। পানি বাড়তে থাকে। চারদিক থেকে চিৎকারের শব্দ কানে আসে। এর মধ্যে একটা বড় ডেগ সংগ্রহ করা হয়। পানি আরও বাড়লে আমার নবজাতক ভাইটাকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হবে।
একদিন গৃহশিক্ষক ছিলাম
বেদনা রঙের ক্ষরণ বইছে। প্রিয় কণ্ঠস্বর নক্ষত্রের মতো আলোকবর্ষ দূরে চলে যায়। গাছ তার পুরনো পাতা কতটুকু মনে রাখে? টেবিলে মুখোমুখি আমরা। বরুণাকে মারতে ইচ্ছা করে। একবার ওর গালে থাপ্পড় মেরে নরম মাংসের স্পর্শ পেয়েছি। তারপর থেকে যখন-তখন ওর গালে আমি একটা অধিকার পেয়ে যাই। মসৃণ গালে পেলবতাও সমানুপাতিক। বরুণাকে অঙ্ক পারা সত্ত্বেও মারি। সমীকরণের অঙ্ক। শুধু এক্সের খেলা। আজ হয়তো চা-নাস্তা আসবে না। ওর মুখের দিকে অন্যদিনের তুলনায় বারবার তাকাই। ও হয়তো একটু আগে গোসল করেছে। শ্যাম্পুর ঘ্রাণ নাসারন্ধ্র ছুঁয়ে যায়। বাসায় কেউ নেই। ওর ঊরু আমার সামনে এলানো। ওদের একটা ফুল বাগান আছে। হাসনাহেনার তীব্র ঘ্রাণে সমস্ত বাড়ি নেশা ধরা। রুপার মতো উজ্জ্বল ওর গায়ের রঙ। ইলেক্ট্রিসিটি নেই, টেবিলে মোম পুড়ছে। ওর জাফরানি ঠোঁটের দিকে আমার নিভু চোখ বারবার প্রলুব্ধ। ওর মুখে মুঠোফোনের টর্চ ফেলি। বরুণা রাগত চোখে তাকায়, মিটিমিটি হাসে।
এক হাজার বছরের তৃষ্ণা
মাঝে মাঝে মনে হয় মস্তিষ্ক এক বিরাট সরিষা খেত। হলুদ সরিষা খেতে মউপোকা অথবা প্রজাপতি দেখা যায়। পোকা শব্দটা শুনলে কেমন জানি গা ঘিনঘিন করে। যন্ত্রণা অনুভূত হয়। মাছির কথা মনে হলে গুয়ের ওপর বনবন শব্দ কানে ভেসে আসে। তখন ভেতরটা গুলিয়ে যায়। কিন্তু মউ। মউই যেন সব টিকিয়ে রেখেছে। মউয়ের সঙ্গে বউ শব্দটার বিষম মিল। ছোটবেলা মা বউ নিয়ে কোনো গল্প না-বললেও প্রজাপতি নিয়ে একটা গল্প বলত। মা বলত, খবরদার রাতের বেলা ঘরে কোনোদিন প্রজাপতি ঢুকলে মারবি না। প্রজাপতির পাখনায় জল ছিটিয়ে দিবি। আপন আত্মা কষ্ট পেলে রাতে ঘরে প্রজাপতি ঢোকে। তারপর বলত, এক লোকের কবরে খুব কষ্ট। তার খুব তৃষ্ণা। কোথাও এক ফোঁটা পানি নেই। সে কাউকে পায় না। পোকামাকড় তার শরীরের মাংস খেয়ে নিয়েছে। এই দুঃসহ অবস্থায় ব্যাঙের সঙ্গে দেখা। তার ধারণা, ব্যাঙ পৃথিবীতে আসা-যাওয়া করে। লোকটি আশান্বিত হয়ে ব্যাঙের কাছে যায়। ব্যাঙ ভাই তুমি পৃথিবীতে গেলে আমার জন্য এক ফোঁটা পানি এনো। ব্যাঙ লোকটির বাড়িতে গিয়ে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর করলে লোকটির ছেলে ব্যাঙের গায়ে প্রস্রাব করে দেয়। ব্যাঙ সেখান থেকে এক ফোঁটা পানি কবরে নিয়ে আসে। এ কথা শুনে লোকটির তৃষ্ণা আরও এক হাজার বছর বেড়ে যায়।
নাভিফুল বাগানের বিদ্যার্থী
নাভিফুল এক ধরনের বিশেষ ফুল। ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। শুধু কল্পনায় এই ফুল ফোটে। আপনি যদি এই ফুল ফোটাতে চান তাহলে আপনাকে চোখ বন্ধ করতে হবে। কি কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। অসুবিধা নেই। প্রথমে কিছু দেখা যায় না। বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকুন। আপনি ঠিক ভাবেই এগুচ্ছেন। হঠাৎ দেখবেন বিশাল বন। বনের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে মেঠোপথ। সেই পথ ধরে হাঁটতে থাকুন। নিশ্চয়ই বুনোফুলের গন্ধ পাচ্ছেন। দেখতে পাবেন লাল মাটি। দুই একটা বানর দেখলেও দেখতে পারেন। শুনতে পাবেন বাঘের হুংকার। ভয় নেই, আপনি নিরাপদেই আছেন। দেখতে পাবেন আপনার চারপাশে উঁচু-নিচু পাহাড়। দেখবেন, পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলধারা। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন, আপনি গহিন অরণ্যে চলে এসেছেন। নিশ্চয়ই দেখছেন একটি পুকুর। সেই পুকুরে অনেক শাপলা। সাদা শাপলা, লাল শাপলা। পুকুরের পাশে পর্দা দেওয়া তাঁবুটি নাভিফুল বাগান। আপনি নাভিফুল বাগান দেখে একটু বেশি আপ্লুত হয়ে গেছেন। ভাবছেন অলৌকিক কিছু। চিন্তার কিছু নেই এখানে, সবকিছুই লৌকিক। নাভিফুল বাগান পাহারা দিচ্ছে দু’জন টুপিওয়ালা। মাথায় টুপি দেখে ভাববেন-না তারা স্বর্গীয় দূত। তারাও পাপ করে। ভাববেন না চুরি ক’রে বাগানে ঢুকে ফুলের গন্ধ শুকে মৌমাছি হয়ে যাবেন। নাভিফুল স্পর্শ করতে হলে আপনার সমৃদ্ধ ব্যাংক অ্যাকাউন্ড থাকতে হবে। মনে রাখবেন, টাকা থাকলেই প্রবাল স্তন আর ফড়িং নিতম্ব স্পর্শ করা যায়।
নিতম্ব ছন্দের কবিতা
টিনের চালে মুড়ি ভাজার শব্দ। কেন জানি বৃষ্টির জলে সমুদ্রের গন্ধ পাই না। পৈঠায় ভিজতে থাকে নয়নতারা। শুকনো পাতার নৌকা ভেসে যায়। পাতিহাঁস খুশি হয়। ছাদে তোমার কাপড় ভিজে যায়। শুকনো কাপড় আনতে গিয়ে তুমিও বৃষ্টিতে ভেজো। তোমার ওড়না হয়ে যায় উড্ডীন পতাকা। উন্মুক্ত বুকের মৌতাতে সবকিছু আউলা হয়ে যায়। মনে পড়ে সমুদ্র ফেনা। তোমার চিবুক বেয়ে জল গড়ায়। কামিজ ভিজে গেলে ভেসে ওঠে ভাজময় অদিতি। বৃষ্টির সঙ্গে খিচুড়ির কী সম্পর্ক, জানি না। ভীষণ খিচুড়ি খেতে ইচ্ছা করছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, তুমি বৃষ্টির ছন্দ। একদিন লিখে ফেলবো তোমার নিতম্ব ছন্দে কবিতা। সেই কবিতায় তোমার ঘ্রাণ থাকবে। মনে রেখো, নিয়তির আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরলে মন ভালো থাকে। ভাগ্যের সঙ্গে টাকশালের সম্পর্ক থাকলেই ভালো। ঢোড়া সাপের মতো বিষহীন দুঃখকে মানুষ আদর করে নাম দিয়েছে সুখ।
রোদের জন্য প্রার্থনা
আমাদের পৈঠায় সব সময় কোনো-না কোনো সবুজ থাকে। আগে পুদিনা পাতা ছিল। ফুল গাছ ছিল। নয়নতারা ছিল। খাবারে পুদিনা পাতার সালাত- সে কী ঘ্রাণ, সে কী স্বাদ! মেডস গাছ আছে। মেডসকে কি গাছ বলা যায়? যাই হোক, মেডসের পাতা দিয়ে চমৎকার ভর্তা হয়। প্রথমে মেডসের পাতা তাওয়ায় টালতে হয়। তারপর লবণ, পিঁয়াজ, পোড়া-মরিচ দিয়ে শীল-পাটায় পিষলে অনন্য আইটেম। গরম ভাতের সঙ্গে যার কোনো তুলনা নেই। জানালা খুললে আমাদের ছোট্ট বাগান। কুমড়ো লতা চালে উঠেছে, পাটশাক বড় হয়েছে, মরিচ গাছে ফুল ফুটেছে। সবকিছু বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। ইলেক্ট্রিক তারে বৃষ্টি প্রথমে ঝিমায় তারপর বড় বড় ফোঁটায় মাটি ছোঁয়। বৃষ্টির হারমোনি দারুণ স্নিগ্ধ। বর্ষার আগে তাপদাহে কী কষ্টই না হয়েছিল। আমাদের বাসা থেকে দশ হাত দূরে পুকুর। মহানগরে থেকেও পুকুরের সামনে বাসা সরকারি কোয়ার্টার বলেই সম্ভব। মৃদু বর্ষণে পুকুর যেন বৃষ্টির বাগান। হাঁসের বৃষ্টি খুব প্রিয়। পুকুর পাড়ে কলাগাছ একবার বুক দেখায়, একবার পিট দেখায়। আষাঢ়ের দুই দিনে রাস্তায় পানি। বাসায় পানি উঠেছে। প্রথমে পাতা পানি, তারপর হাঁটুপানি, তারপর কোমর পানি। আশে-পাশে দু’একটা সাপও দেখি। আর বৃষ্টি নয়। এবার রোদ উঠুক।
চলবে

