আমার কারারক্ষী বাবা
প্রতিদিন বাবা চোর পাহারা দেয়। চোর পাহারাই তার কাজ। আমরা কোনো রকমে খেয়ে-পরে আছি। আমার বাবাকে মা প্রায়ই বলে, কেন তুমি পড়াশোনা করলা না। এই কথা শুনে মাকে বলি, বাবা যদি পড়াশোনা করতো তাইলে তোমার কী লাভ হইতো? তখন তো তোমার সঙ্গে বাবার বিয়ে নাও হইতে পারতো। মা বলতো, ‘আমার কোথাও-না কোথাও কিছু একটা হইয়া যাইতো। তুর বাপতো ভালো থাকতো’। আমার মা যেমন সুন্দর। আমার বাবা ঠিক তেমন কালো। বাবা মাকে দু’মুঠো খাবারই দিছে। মার সাধ-আহ্লাদের বৃষ্টি সব সময় মরুভূমি থেকেছে। এই চোর পাহারার চাকরিতে শুধু কষ্ট আর কষ্ট। ওয়াল ডিউটিতে টানা ৬ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ডিউটিতে যেতে ৫ মিনিট দেরি হলে আমার বাবাকে শাস্তি পেতে হয়। বাবা সারা বছর ছুটি পান ২০ দিন। পাবার মধ্যে বছরে দুইটা বোনাস। বোনাসের টাকায় ঠিকভাবে কাপড়-চোপড় কিনতে পারি না। কোরবানি দিতে পারি না। আব্বাকে একদিন কইলাম, জেলখানার গল্প কও। আব্বায় কয় তাইলে শোন: এক ফাঁসির আসামিরে জিগাইছি, কীরে, তুই কোন কেইস খাইছস? চোরায় কয়, সৌদি আরব থাকতাম। দেশে আইসা বিয়া করি। কয়েক মাস থাইকা আবার চইলা যাই। বউয়ের লগে যোগাযোগ হইতো চিঠিতে। দশ বছর পর বাড়িতে আইসা দেখি আমার দুই ছেলে, দুই মেয়ে। বউরে জিগাইলাম এই পোলা-মাইয়া কার? শালির বেটি কয় আমার। মাথা ঠিক রাখতে পারি নাই। একটা দাউ দিয়া সব কয়টারে শেষ কইরা দিছি।
পাপ পাপি, পাপি পাপ
পাপবোধ আর আগের মতো উত্তপ্ত হয় না। মাঝে-মধ্যে বেখেয়ালে একটু নড়াচড়া করে। শক্ত ধমক দিলে আবার মরা মানুষের মতন ঘুমায়। একথা আমার প্রতিবেশী বন্ধুকে বললে সে-ও একই কথা শোনায়। যেহেতু আমরা টো-টো কোম্পানির ম্যানেজার, কাজেই কিছু একটা করতে পারি। প্রথমে ঠিক হয় আমরা একটা জরিপ করবো। কাউকে যদি সরাসরি একথা জিগ্যেস করি, আমাদেরকে মাইর দিতে পারে। মাইর খাইলে খামু। রাস্তায় বের হয়ে এলাকার একজনকে পাই। তাকে বলি, ভাইজান আমরা একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করি। একটা প্রশ্নের উপর জরিপ করছি। আপনি কি একটু সহযোগিতা করবেন? লোকটি বলে, প্রশ্নটা কী, করেন? আচ্ছা আপনার পাপবোধ আগের থেকে বাড়ছে না কমছে? লোকটা হাসে। বিশ্বাস করবেন, সেদিন কী হইছে! রাতে বাসে করে বাসায় ফিরছি। অন্ধকারে এক তরুণীর নিতম্বে হাত দিতে গিয়ে, এক লোকের পকেটে হাত ঢুকলে রামধোলাই খাই। তেমন খারাপ লাগেনি। সেই রাতে কি ভালো ঘুম হয়? আমরা তার সঙ্গে আর কথা বাড়াইনি।
সুন্দর একটা দরজা দেখে ডোরবেল বাজাই। এক সুন্দরী অভ্যর্থনা দিয়ে ঘরে বসায়। ড্রয়িং রুমটা বেশ পরিপাটি। অ্যাকুরিয়ামে নীল মাছ। তাকে প্রশ্ন করার আগেই আমাদের জন্য নাস্তা চলে আসে। নাস্তা খেতে খেতে ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা চলে। জরিপ সম্পর্কে বিস্তারিত শুনে মহিলা বেশ খুশি। বলে, আপনারা একটা সময় উপযোগী কাজ করছেন। চা শেষ না হতেই পুলিশ আসে। আমাদেরকে ডাকাতির আসামি করা হয়। আমরা কারাগারে পাশাপাশি থাকি। আমরা একে অপরের দিকে পাপবোধ নিয়ে তাকাই।
মনজফুলের কোনো গন্ধ নেই
টুনটুনির বাসার পাশে করমচা ঝোপ। করমচা ঝোপের আড়ালে লোভ এবং কাম থাকে। তারা একে অন্যের কাছে অপরিচিত। একদিন লোভ তার রূপ দেখিয়ে যায়। কামের ঘুম ভাঙতে এর বেশি আর কোনো কিছুর দরকার হয় না? মনজফুলের কোনো গন্ধ নেই, বোঁটা আছে। কোনো মধু নেই, সমস্ত মধুর উৎস আছে। লোভের শুধু লোভ আছে। কামের শুধু কাম। কাম তখনো নাবালক। বয়স বাড়তে থাকে। একদিন বুঝতে পারে তার ভেতরে কী জানি একটা! পুকুরে গোসল করতে থাকা মাঝবয়সী শরীর তার ভালো লাগে। অনুমান করতে পারে ভেজা শাড়ির অরণ্য। অরণ্যের গভীরতা। ভেজা কামিজে রয়েছে অধিক সবুজ। সবুজের সঙ্গে রোমান্স অনেক বেশি রঙিন। কাম আর লোভের ভাব হয়। তারা কাছাকাছি পাশাপাশি। লোভ জানতে চায়। কামের আবার কী আছে? কাম বলে, কিছু নেই। লোভ বলে, গহনা লাগবে, বাড়ি লাগবে, গাড়ি লাগবে। কাম বলে, হয়ে যাবে। এভাবে তিন দিন, সাত দিন, এক মাস, এক বছর, পাঁচ বছর যায়। কাম লোভকে বলে, হাত দাও। লোভ বলে, আগে গহনা হোক। কাম চাকরির চেষ্টা করে। চাকরি হয় না। সে লোভের কাছে যায়। গহনা পরে হবে, আগে স্পর্শ দাও। লোভ বলে, স্পর্শ পাবে না। কাম রাগান্বিত হয়ে লোভকে বলে, বেশ্যা আর প্রেমিকার মধ্যে পার্থক্য কী?
সব প্রেমিকার মধ্যে একটু-আধটু বেশ্যা থাকে। সব মাছই গু খায়, দোষ হয় শুধু ওকল মাছের! লোভ আস্থা খোঁজে। যেখানে আস্থা পায় সেখানেই গোপনীয়তা জল হয়ে যায়। এর মানে, ছাপা কাগজে লোভের সুখ। টাকার কাছে মৃত্যুও দাস। কেন, শরীরের টান কি শুধু কাম অনুভব করে। শরীরের টান লোভের নেই?
তারেই বলি কৃষ্ণকলি
শান্ত খালের পাড়ে শ্যামল ক্ষেত। এখানে আগে খাল ছিল না। রাস্তা হয়েছে বলেই খাল হয়েছে। সব রাস্তা পথ দেখায় না। কোনো কোনো রাস্তা যায় গন্তব্যের দিকে। দেখতে শ্যামল হলেও দু’ধরনের ধান পাশাপাশি। বোরকায় সুন্দরী নিজের রূপ আড়াল করতে চাইলে কতটুকু আড়াল করতে পারে? দেখতে সবুজ হলেও পোলাও ক্ষেত একটা ঘ্রাণ বাতাসে ছড়ায়। মোটা চাল আর পোলাও চালের রূপেও বিস্তর ব্যবধান। মোটা ভাত খুব সহজে খাওয়া যায়। পোলাও খেতে ইলিশ মাছ লাগে, মুরগির রান লাগে, মাংস লাগে। শুঁটকি তরকারি দিয়ে কেউ পোলাও খায় না। মোটা ভাতের সঙ্গে পোলাও ভাতের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। যেই ধানে খই ফোটে, সেই ধানে ভাতও হয়। পেট শুধু খাবার চায়? নৈতিকতা তার অভিধানে নেই। কুমড়ো ফুলে পতঙ্গ খাবার অন্বেষণ করে বেড়ায়। ফুল দেখলেই পতঙ্গের আর হুঁশ থাকে না। পতঙ্গের ধর্ম ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানো। এক কাজে দুই কাজ হয়ে যায়। ফুল পেয়ে যায় তার পুংরেণু। মৌমাছি পেয়ে যায় তার মধু। সব চাকে একটা রানি থাকে। রানিকে ঘিরে তার বিশাল কর্মী বাহিনী। কর্মীরা কতই না নিবেদিত। রানি কি জানে, কয়টা প্রাণ নষ্ট হলে সে রানি? অথবা সুন্দরী কি জানে, কয়জন কালিনির পর সে সুন্দরী? যদি কোনো সুন্দরী পূর্ব-সুন্দরী খুঁজতে যায় তাহলে সংখ্যারেখার মতো খুঁজে পাবো সুন্দরীর বিপরীতে কুৎসিত। সুন্দরীর কলঙ্ক থাকলেও পুরুষের জিন খুব সহজে রাবার ঘষতে পারে। কৃষ্ণকলির যোগ্যতায় পুরুষের আহ্লাদ বড় ম্লান। তাই বলে কি কৃষ্ণকলির বিয়ে হয় না? কৃষ্ণকলিরাও মা হয়।
শেষ পর্যন্ত অন্তিম গহ্বর
জন্মের পর চিৎকার দিয়ে জানান দিতে হয়, মা আমি বেঁচে আছি। অপরিচিত পৃথিবীতে প্রথমে সবকিছু ভয় লাগে। মা, বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। অন্য সবার সঙ্গে আস্তে আস্তে সম্পর্ক বাড়ে। এক সময় মায়ের বুকের দুধ ছেড়ে খিচুড়ি, খিচুড়ি থেকে মাছ, মাছ থেকে মাংস-এর মধ্যে কথা বলতে শিখে যাই। ভাঙা ভাঙা শব্দে আব্বা ডাক দিই। তাতেই পরিবারের সদস্যদের আহ্লাদ বেড়ে যায়। বাবাও অনেক খুশি হয়। বয়স বাড়তে থাকে তিন, চার... স্কুলে ভর্তি হই। কবে বড় হবো। প্রাইমারি পাস করতে হবে। এসএসসি পাস করতে হবে। কবে মাথা কেওয়ার ছোঁবে। নাকের নিচে গোঁফের রেখা ভাসলে এসএসসি পাস করি। আরও অনেক পড়তে হবে। স্নাতকোত্তর পাস করতে হবে। চাকরি করতে হবে। এই পরিকল্পনা টেবিল থেকে গ্লাস ভাঙার মতো একটা শব্দ তুলে এক দৌড়ে জিতে যাই। অনেক বিড়ম্বনার পর চাকরি। একটা ভালো চাকরি অনেক দিনের নিশ্চয়তা। চাকরির দু’বছর পর বিয়ে। সন্তানের মুখ থেকে আধো আধো কথা। আমার বাবারও বোধহয় এরকম ভালো লেগেছিল। ছেলে-মেয়ে বড় হলে তাদেরকে ভালো স্কুলে ভর্তি করতে হবে। সার্টিফিকেটে নম্বরের জোর ভালো থাকলেই যেন ছেলে-মেয়ে মানুষ হয়ে যায়। ছেলে-মেয়ে ভালো সার্টিফিকেট অর্জন করে। তাদের বিয়ে দিই। মেয়েটা অস্ট্রিলিয়ায় থাকে। ছেলেটা ডাক্তার। বাড়িতে নতুন মানুষ আসে। ততদিনে বয়সগড় আয়ু ছাড়িয়ে যায়। রোগ-শোক সঙ্গে নিয়ে চলতে থাকে কবরের প্রস্তুতি। কবরে কেউ সহজে যেতে চায় না। হাসপাতাল, বাসা; বাসা, হাসপাতাল। অনেক টানাটানির পর খাটিয়ায় শুতে হয়। প্রথম চিৎকার থেকে শেষ নিঃশ্বাসের মধ্যবর্তী সময়টা পালকের মতো হালকা মনে হলেও বুকের ভেতর একটা আস্ত পাথর বসে থাকে।
চলবে



