মনে হচ্ছিল, রাতে কোথাও যাচ্ছিলাম, তবে কোথায় যাচ্ছি তা নিশ্চিত নই।
সকালে দুজনের জন্য দুটি অমলেট আর ফ্রজেন পরোটা সেঁকে নিয়ে বসেছি টেবিলে।
তুমি দ্বিধাহীন মুখ খুললে, ‘রাতে কোথায় যাচ্ছিলে?’
বললাম, ‘আমার ঘুমের মধ্যে হাঁটার অভ্যাস আছে।’
‘স্ট্রেঞ্জ।’ কিছুটা থেমে বললে, ‘ডাক্তার দেখাওনি?’
‘এটা ডাক্তার দেখানোর জিনিস কিনা ভাবছি…!’
তুমি বিরক্ত হলে।
বিয়ের প্রথম সকালে বিরক্ত হওয়ায় তোমার ভালো লাগলো না, তবুও তোমাকে বিরক্ত দেখে আমার ভালো লাগলো।
বললাম, ‘কফি করি?’
তুমি নিরুত্তর।
দুজনের জন্য পানি দিলাম কেটলিতে, দুটি কাপ নিলাম।
আমরা কফি নিয়ে বসেছিলাম বারান্দার মেঝেতে। নাশতার সময় তোমাকে শাড়িতে দেখেছিলাম, এখন সালোয়ার কামিজ পরেছ।
তুমি কফিতে চুমুক দিয়েই তা কোথায় ফেলবে খুঁজে না পেয়ে গিলে ফেললে। আমি তোমার তিক্ত স্বাদ নেওয়ার মুহূর্তটি দেখলাম।
নীরবতা ভেঙে বললাম, ‘চলো, বেড়িয়ে আসি।’
কিন্তু কোথাও যাওয়ার মতো আবহাওয়া ছিল না। প্রচণ্ড গরম। ফ্যান চলছে, শোডশেডিংও সমান তালে। মনে হলো, দমবন্ধ হয়ে মারা যাব।
আবার বললাম, ‘চলো, রিকশা নিয়ে জাদুঘরে বেড়িয়ে আসি।’
তুমি জেরা শুরু করলে, ‘রাতে কোথায় যেতে চাচ্ছিলে?’
: কোথাও না। কোথায় যাব?
: যাচ্ছিলে।
: ঠিক মনে নেই। আমার স্লিপওয়াকিং আছে বোধহয়।
: বোধহয় মানে?
: ঘুমন্ত আমাকে তো দেখতে পাই না। তাই বোধহয় বললাম।
ভেতরে ফ্যান ও বাতি দুইই জ্বলে উঠলো। আমরা বিছানায় হেলান দিয়ে বসলাম। আমাদের কোথাও যাওয়া হচ্ছে না বুঝতে পারছি। আমি হেলান দেওয়া থেকে ধীরে ধীরে শুয়ে পড়লাম। মন কেন তিক্ত হয়ে উঠছে বুঝতে পারছি না।
তুমি উঠে গিয়ে পর্দা টেনে দিলে। বাতিও। একপ্রস্থ ঘাম ঝরে ঝরে এখন ঠান্ডা লাগছে। ইচ্ছে হচ্ছিল শর্টস পরি।
সবেমাত্র সকাল ৯টা বাজে। একটা জরুরি ফোন আসতে পারে, বা কারো মৃত্যুর খবর জানিয়ে, যদিও তেমন কেউ নেই। এমন ফোন এলেও কি ওকে নিয়ে বা বাসায় রেখে যেতে পারতাম!
‘চলো ডাক্তারের কাছে যাই।’ কিছুক্ষণ থেমে তুমি বললে, ‘এখন বাংলাদেশ মেডিকেলে ডাক্তার পাওয়া যাবে।’
‘ডাক্তার দেখানোর মতো কিছু ঘটেছে কি?’ ওর মুখ পরীক্ষা করে বললাম, ‘তুমি বললে অবশ্যিই যাব।’
‘আজ রাতেও যদি এমন হয়, আমি সামলাব কীভাবে?’ ও বলল।
‘তুমি দৃশ্যগুলো বলো। দেখি আমি ততটা ভয়ংকর হয়ে উঠেলিলাম।’
তুমি একসেট নতুন পোশাক নিয়ে বসার ঘরে গেলে। ফ্যানের সুইচ অন করার শব্দ পেলাম। আবার শোবার ঘরে ফিরে এসে ‘তুমি একটু ওদিকে যাও।’ বলে বাথরুমে গেলে। আমি বিছানা থেকে নেমে বসার ঘরের দিচ্ছে যাচ্ছিলাম।
পানি ঢালার শব্দ শুনলাম দরজা পেরিয়ে যাওয়ার সময়।
ফ্যানের নিচে চেয়ার টেনে বসলাম। তুমি দরজা বন্ধ করছিলে। দরজা বন্ধ করতে পারছিলে না। সিকটিনি নেই।
আমি তোমার পোশাক পাল্টানো কল্পনা করছিলাম।
শরীর জেগে ওঠার বদলে আমি ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। মনে হচ্ছিল, চেয়ার ছেড়ে ফ্লোরে গড়িয়ে পড়ছি, আর ঘুমের মধ্যে কোথাও চলে যাচ্ছি।
২
সাইকিয়াট্রিস্ট আমার দিকে না তাকিয়েই প্রেসক্রিপশন লিখতে শুরু করলেন। যেন এখনই ইমার্জেন্সিতে চালান করে দিচ্ছে।
‘রাতে ঘুমের মধ্যে হাঁটছিল, আর অস্বাভাবিক আচরণ করছিল।’ ও একটানে বলতে চাইল, ‘এখানে আসার আগেও, আমি বুঝতে পারছিলাম না, ও জেগে আছে না ঘুমিয়ে।’
আমি অবাক হলাম, ‘কখন? কী বলো এসব? আমি তো বসার ঘরে…’
কথা শেষ করার আগেই ডাক্তার প্রেসক্রিপশন বাড়িয়ে দিয়ে বেল বাজালেন। বাইরে তখনও রোগিতে করিডোর গিজগিজ করছে।
ওষুধের দোকানে প্রেসক্রিপশন দিতে যাচ্ছিলাম, তুমি টেনে নিলে, ‘পরে কিনব।’
আমরা ফুটপাথ ধরে হেঁটে হেঁটে আবাহনী মাঠের সামনে এসে বটগাছের ছায়ার নিচে দাঁড়ালাম। ঠান্ডা মাঠা বিক্রি করছিল একজন। পথচারী ও রিকশাওয়ালারা তা খাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি করছিল।
আমি ‘খেতে চাও?’ বলে হাঁটতে শুরু করলাম।
তুমি দাঁড়িয়ে রইলে, আবার বললাম, ‘খেতে চাও?’
তুমি আস্তে করে কিছু বললে, যা আমি শুনলাম না।
কিন্তু কথাটা কান্নার মতো মুখের ভেতর এসে আটকে গেল। আমি পানি পড়ার রেখাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, তুমি চোখ সরিয়ে নিলে না, অশ্রু ঘামের সঙ্গে মিশে গেল।
তোমার হাত ধরতে গিয়েও থেমে বললাম, ‘একটা ছাতা থাকলে ভালো হতো। আমার মাইগ্রেনের ব্যথাটা চাগিয়ে উঠেছে।’
তুমি কোনো কথা না বলে আমার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলে। আমি রিকশা ডাকছিলাম, কিন্তু রিকশায় ওঠা হলো না। গরমে রাস্তা ফাঁকা হয়ে আছে।
‘আমি হোস্টেলে ফিরে যাব।’
আমি চুপ রইলাম। জানি না, যেতে বলব, না বলব না। ও যা করতে চাইবে তাই তো করবে, নাকি বাঁধাও দেব।
‘আমি এখানে থাকতে পারব না। আই অ্যাম ফিলিং ইনসিকিউড।’
আমি কিছু বললাম না। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম, দুই বাটি খাবার আমাদের দরজার সামনে অপেক্ষা করছে।
তুমি রিকশা ডাকলে। রিকশা এলো। মধুবাগ যাবে না। আমরা স্টার কাবারের পাশের রাস্তা ধরে রায়েরবাজারের দিকে হাঁটা দিলাম। কখনও পাশাপাশি, কখনও তুমি পিছনে, কখনও সামনে। এক ঝটকা গরম সিঙারার ঘ্রাণ আমাদের, বা শুধু আমাকেই পাগল করে দিলো। কল্পনায় বিট লবণ ছিটিয়ে পেঁয়াজকুচি দিয়ে গরম গরম শিঙাড়া খেলাম।
বাসায় ফিরে দেখি দরজার কাছে খাবারের বাক্স রাখা নেই।
আমার মুখ থেকে আর্তনাদের মতো বেরিয়ে এলো, ‘এ কী খাবার দিয়ে যায়নি!’
ফোন করলাম ক্যাটারিংয়ে। ফোন ধরল না।
বললাম, ‘আজ মনে হয় খাবার দেবে না। চলো বাইরে খেয়ে আসি।’
তুমি জামাকাপড় না গুছিয়েই ব্যাগে ভরতে ভরতে খুঁজছিলে কী নিয়ে এসেছিলে, আর ভাবছ, কী ফেলে যাচ্ছ। আমি গামছা পরে বাথরুমে গিয়ে গায়ে মগ মগ পানি ঢালতে শুরু করলাম। হয়ত বের হয়ে দেখব তুমি চলে গেছ। যাওয়ার সময় কী বলে যাবে আমি জানি না। হয়ত দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে গালে চুমু খেয়ে কিছু বলবে।
তুমি ওড়না দিয়ে কান্না চাপা দিয়ে চলে গেলে।
৩
আমার খুব অ্যাসিড হচ্ছিল। বুক চাপ ধরে আছে। ভেজা গামছা খুলে আর কিছু পরলাম না, মেইন গেটের সিককিনিও দিলাম না। ন্যাংটো হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুমের মধ্যে শুনতে পাচ্ছিলাম, কে যেন দরজার কড়া নাড়ছে? আমি চেঁচিয়ে বলছিলাম কিছু। ক্যাটারিংয়ের লোকটা সম্ভবত, রাতের মিল? একটা না দুইটা?
আমার ঘুম ভাঙল। বাইরে তাকিয়ে দেখি কিছুটা গরম কমায় শহরটা জেগে উঠেছে। মাথাটা ফাঁকা হয়ে আছে। সাকুরায় গেলে এসির মধ্যে এগারোটা পর্যন্ত হুইস্কি নিয়ে বসে থাকা যাবে। কিন্তু আমাকে একা পেলে কেউ এসে ঘোষণা করবে, কে বাজারি, আর কে বাজারি নয়।
ওই তো কনুই দিয়ে দরজা ঠেলে ঢুকলো আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। ঠোঁটে সিগারেট। মোস্তাকিমকে ডাকলো। মোস্তাকিম ডাবল দুই পেগ টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, ‘স্যার, সাথে আর কী দেব?’
হেমিংওয়ে বরফভাসা হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে বলল, ‘দাও, মার্লিন মাছ দাও।’
মোস্তাকিম অর্ডার-স্লিপ কেটে এক কাঁধে বৈঠা, অন্যহাতে বড়শি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
‘শালা! ধরে আনবে তেলাপিয়া!’ বলল হেমিংওয়ে।
আমি দরজার সামনে থেকে দুটি খাবার বাক্স তুলে চেয়ারে রাখলাম। ছিটকিনি দিলাম না। বিছানায় বসে মনে হলো তোমার ঘ্রাণ বেডশিট ও বালিশে মেখে আছে।
আমি নাক ছুঁয়ে ছুঁয়ে শুঁকে দেখলাম।
নরম ও উষ্ণ লাগছে।
আমার শরীরও কিছু বলতে চাইছে। আমি তাকে থামালাম না।

