ডাক্তার আমার চোখে আলো ফেলে বলছিল, ‘আপনি তো আলো সহ্য করতে পারেন না!’

চেয়ারটি ছিল নব্বই ডিগ্রি, আমি বসতে না বসতেই এমনভাবে হেলিয়ে দিল, আমি না পারছি উঠতে, না পারছি স্বস্তিতে বসতে।

ডাক্তার মাথায় একটা লাইটওয়ালা হেলমেট পরল, হাতে একটা গোল লেন্সও দেখতে পেলাম, তারপরের স্মৃতি বলতে চোখের ভেতর আলোর তীব্র চিৎকার, যেন বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে দিচ্ছে কেউ।

আমাকে ছেড়ে দিয়ে ডাক্তার তার চেয়ারে বসল। আবার উঠল। মুখে রা নেই। সহকারীকে নির্দেশ নিয়ে চলে গেল। অফিস স্টাফ আমাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলল।

আমি ওই মুহূর্তের স্মৃতির ভেতর ঢুকে খুঁজতে চেষ্টা করলাম, আলোছুরি ঢোকার সময় আমি কী ভাবছিলাম, বা ডাক্তার আমার সহ্যক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছিল তখনই বা কী ভাবছিলাম।

সহ্য করার প্রসঙ্গে আমি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কথা ভাবছিলাম। কোনো নিউজে পড়েছিলাম তার আলোর সংবেদনশীলতা এতটাই খারাপ, ঘরের ভেতরও কালো চশমা পরে থাকতে হতো। মানে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছাড়া আমার আলোর সংবেদনশীলতা নিয়ে কোনো তথ্য মাথায় নেই। আর, অন্যটি কেবল দৃশ্য, দৃশ্য না যন্ত্রণা ঠিক বুঝতে পারছি না, নায়াগ্রা প্রপাতের মতো ধারালো আলো ঢোকার।

আমার একটি চোখ তুলে ফেলতে হয়েছে। এক চোখে দুনিয়া দেখায় ক্লান্তি আছে, আছে না থাকা চোখ দিয়ে দেখার ভুলও। দুটিই একসাথে ঘটছে।

আমি গার্ডদের না বলে স্কুটি হাসপাতালের নিচে ফেলে এলাম, ফেলে এলাম মানে চুরি হলে আমি কারো দায় দিতে পারব না, কাল কিছু বকশিশ গুনতে হতে পারে।

আমি চোখ বন্ধ করে অটোরিকশায় উঠলাম। লালমাটিয়া যেতে না যেতেই ঝুম বৃষ্টি, রিকশাওয়ালোকে বললাম পলিথিন দেওয়ার জন্য। সে কিছু শুনতে পেল না, বা আমি কিছু বলিনি, এমনভাবে সে রিকশা তীব্র বেগে চালাতে লাগলো।

নজরুল ইসলাম রোডে খানাখন্দের ভেতর রিকশাটা অ্যাক্সিডেন্ট করে সামনে চাকা ভেঙে বেরিয়ে গেছে, পেছনের অংশটা দেখে মনে হচ্ছে একটা মহিষ জুড়ে দিলে এটা চলতে শুরু করবে।

নতুন করে পাওয়া আঘাতকে আমি আর গুরুত্ব দিলাম না।

‘ব্যথা পাইছেন ভাই, ব্যথা পাইছেন ভাই’ বলছিল পথচারীরা। তাদের মধ্যে কেউ হয়ত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেছে, তারপর সে চুপ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কী যেন ভাবছিল।

আমি এমনভাবে হাঁটতে শুরু করলাম, একসাইজ ছোটো জুতা পায়ে দিয়ে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলে লোকে যেমন স্বাভাবিক থাকে তেমন।

আমার সাথে সাথে শ্যাওলাপরা পাথরের সিদ্ধার্থ হাঁটতে শুরু করলেন।

আমি তাকে বললাম, ‘আচ্ছা ভগবান, ধরুন, আপনি ছোটোবেলায় হাসপাতালে গেলেন জীবনের প্রথম নড়া দাঁত তুলতে।

আপনি আপনার মামার সঙ্গে করিডোরের বাইরে দাঁড়ালেন। একজন লোক এসে নিচু হয়ে সাঁড়াশি দিয়ে দাঁত তুলে দিল।

আপনি আহ্ করে উঠলেন।

মামা বলল, দুধ দাঁত তুললে বেশি ব্যথা লাগে না।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় মা দেখলেন, আপনার নড়া দাঁতটি রয়ে গেছে।’

সিদ্ধার্থ অবাক হয়ে বললেন, ‘স্ট্রেঞ্জ!’

আমাকে কিছু বলতে না দেখে তিনি আবার বললেন, ‘স্ট্রেঞ্জ! তোমার সঙ্গে এমনটা হয়েছে?’

আমি চুপ রইলাম।

মীনা সুইটসের মুখে এসে সিদ্ধার্থ বললেন, ‘এসো মিষ্টি খাও।’

: কেন? সহ্য ক্ষমতা আছে সেজন্য?

: না, ঠিক তা নয়, আবার তা-ও।

আমি তাকে সলিমুল্লাহ রোডের দিকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম।

গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় রিকশার জট। হর্নের শব্দে কান ফেটে যাওয়ার দশা।

আমরা দুজন দুটি আইসক্রিম নিলাম। সিদ্ধার্থ আকাশি রঙের ললি, আমি কোণ। আইসক্রিম কামড়ে নিয়ে যেখান থেকে দাঁত উপড়ে গেছে সেখানে ছেঁড়া মাড়ির উপর চেপে দিলাম।

আমার বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল না। সিদ্ধার্থ বিদায় নেওয়ায় আমার করণীয় কিছু নেই। ফোন ও মানিব্যাগ ছিনতাই হওয়ারও চান্স আছে। আমি রাগপায়ে হেঁটে মাঠের মধ্যদিয়ে ওয়াল্টন গলি ধরলাম।

২
রাত ১টার কাছে পৌঁছে মনে হলো একটা ঘুমের ওষুধ খাওয়া উচিত, কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না, গা ঘেঁষে তুতু ঘুমাচ্ছে, ওইপাশে তমা আছে কিনা বুঝতে পারছি না। বিছানা গোছানোর সময় বালিশ দিয়ে রেখেছিলাম। ঘুম আনার কোনো চেষ্টা করলাম না।

মাঝে মাঝে গ্যারেজে গাড়ি ঢোকে, কেউ কেউ হর্ন বাজায়। বৃষ্টি হচ্ছে বোধহয়। আমি জানি, আমার কী পরিণতি হতে যাচ্ছে। শেষ রাতে ঘুম আর নির্ঘুমের মাঝখানে ঝুলে থাকব, সকালে ঘুম গাঢ় হতে না হতেই তুতুকে নিয়ে উঠতে ছুটতে হবে স্কুলে।

আমি নিজের মধ্যে খিঁচ খেয়ে রইলাম। একসময় মনে হলো, আমার পাশে তুতু নেই, তমা। তমা আমার গায়ের সঙ্গে পেছন ঠেকিয়ে শুয়েছে, বা ঘুমিয়েছে। আমি এই স্পর্শকে কোনো ইঙ্গিত মনে করে তার গেঞ্জির ভেতর আলতো করে হাত ঢোকাই।

কেটে ফেলা স্তনটি পেরিয়ে অন্য স্তনের কাছে পৌঁছাই, কিন্তু সেটিরও অস্তিত্ব টের পাচ্ছি না। জিজ্ঞেস করব কিনা, ‘তমা, তোমার আরেকটি স্তন কোথায়?’

ইনকেইস সে সেটিও হারিয়ে ফেললে তা জানতে চাওয়া হবে খুবই অশোভন। আমি বুকের ওপর আলতো করে হাত বোলাতে লাগলাম কোথাও আঙুলে নিপল বাঁধলো না।

সকালে তমাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি রাতে বিরক্ত করেছিলাম কিনা। তমার ভাষায় সংগম করা বা করতে চাওয়া মানে বিরক্ত করা। তমা বারান্দায় যেতে যেতে উত্তর দিল। যেটা আমার কাছে হ্যাঁ, বা না কিছুই মনে হয় না।

আমার স্মৃতির ভেতর কী আছে আমি তা খুঁজতে নামলাম। তার আগে ইলেকট্রিক কেটলিতে পানি ফুটতে দিলাম। কাপে পানি ঢেলে তাতে ইন্সট্যান্ট কফি গুলতে গিয়ে মনে হলো পানি কি গরম হয়নি। সাবধানে আঙুলটা ডুবিয়ে দিয়ে বুঝলাম ঠান্ডা। আচ্ছা কোল্ড কফিই খাওয়া যাক। কয়েক চুমুক খাওয়ার পর মনে হলো, সরাসরি ওয়াসার পানি খাওয়া ঠিক হবে না।

গোলানো কফি কেটলির মধ্যে ফুটতে দিয়ে আরাম চেয়ারে ঝিমাচ্ছিলাম। কফি ও ফেনা হঠাৎ বাইরে বেরিয়ে এসে ফ্লোর মাখিয়ে ফেলল। আমি জলদি কানেকশন অফ করে কাপে কফি ঢেলে নিলাম। কয়েক চুমুকে কফি শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছি অফিসে যাওয়ার পথে কফি ওয়ার্ল্ড হয়ে যাব কিনা, তৃষ্ণা রয়ে গেছে।

কফি খাওয়ার পর স্মৃতির ভেতর নামতে পারলাম না, তৃষ্ণার কথা বারবার মনে হচ্ছে, একটা সিগারেট খেতে পারলেও তৃষ্ণাটুকু চাপা দিতে পারতাম।

তবে খুব না তলিয়ে ভেবে যেটুকু বুঝলাম, পেছন থেকে যন্ত্রটি তার প্রবেশমুখে ঠেকাতেই বুঝলাম, সে প্রস্তুত নয়। ঘাসে ঢাকা শুকনো মাটি। অভিমানও জাগছিল, এতদিন পর কাছে এল, ফল্গুধারা বইলো না! তারপর উপরে উঠে একটু লালা ব্যবহার করেও মনে হলো সুবিধা হবে না, এরই মধ্যে তুতু লাফিয়ে এসে গায়ের মধ্যে পড়ল। ওর ঘুমন্ত মুখটা প্রায় ঝাপসা চোখে দেখলাম। ঠোঁট একটু ফাঁক হয়ে আছে। তমা ওকে সরিয়ে দিল, মানে তমা চাইছে? তুতু আবার আমার গায়ের উপর পা তুলে দেয়, আমি নেমে পড়ি। দ্রুত উত্তেজনা হারাই। তমার একটি হাত আমার যন্ত্রকে খুঁজতে বের হলে আমি আমাকে সরিয়ে নেই । আমি অপ্রস্তুত তমার ভেতরে ঢুকতে চাচ্ছিলাম না।

সকালে তমার মুখ দেখা হয়নি। দেখা হয়নি, মানে দেখিনি, বা দেখি না। তাকাতে হলে মুখের নিচে তাকাই, বা পায়ের দিকে। মুখের নিচে তাকাতে গিয়ে তার দুটি উঁচু স্তন দেখলাম। এর মধ্যে কোনো একটি নেই, অন্যটি আছে কি নেই তাও নিশ্চিত নই।