সন্ধ্যায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি। ঘুমাব না। শুধু চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকব। চোখ খুললে অনেককিছু দেখা লাগবে। বাতি নেভাতে পারতাম, কিন্তু যে কেউ বাতি জ্বালাতে পারে। তার চেয়ে বাতি জ্বলা ভালো।
ইস্কাকে বলেছিলাম আমার কাছে পড়তে বসতে। তার মুখ ক্রুদ্ধ। বাধ্য করলাম। ড্রয়িং খাতায় একটা দাগও ঠিকঠাক দিতে পারল না, দিল না। বিশ্রী করে চায়ের কেটলির নল এঁকেছে, অনেকটা শিশুদেহে বড়োদের পেনিসের মতো।
চিন্তা আগেই বলেছে, পড়বে না। কাল স্কুলেও যাবে না। কেন যাবে না, তার কারণ অস্পষ্ট। শুধু বলল, ওর পনিটেলকে রিশাত রসুন বলেছে।
আমার ক্লান্তি নেই, কিন্তু অফিস থেকে ফেরার পর অবসাদ পেয়ে বসেছে। এখন আনন্দ কেবল ঘাম ঝরানোয়। রানি আমাকে দরজা বন্ধ করে দিতে বলে। আমি বলি, ‘ওদের খেলতে পাঠাও, মুড অফ করে বসে আছে।’
ওরা খেলতে যেতে চায় না। রানি ওদের বের করে দেয়। বলে, ‘গ্যারেজে খেলো।’
আমি চোখ বন্ধ করে দরজা ভেড়ানোর শব্দ পেলাম। ছিটকিনি দেয়নি। মানে, অন্য কিছু নয়।
রানি আমার পাশে শোয়। আমি নড়ি না।
‘তুমি আমাকে ছোঁয়া বন্ধ করেছ কেন?’
আমি বলি, ‘তুমিই বলো।’
সে উত্তর দেয় না।
এর মধ্যে দরজা খোলার শব্দ। চিন্তা ফিরে আসে। রানি ও চিন্তা কথা বলে।
‘খেলব না।’
‘কেন?’
‘সামিরা চিপস দিচ্ছে না।’
‘যাও দোকান থেকে কিনে আনো। ইস্কাকে নিয়ে যাও।’
‘না যাব না।’
চিন্তা আমাদের দুজনের মাঝখানে শোয়। অহেতুক চিৎকার-চেঁচামেচি করে কানের কাছে মুখ এনে। কানের ভেতরের ছোট হাড়টি ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। আমি থামতে বলি, সে কথা শোনে না।
কিছুক্ষণ পর খেলতে চলে যায়, ইস্কাও যায়। আমি গলা চড়িয়ে বলি, ‘তোমরা দুজনই তো খেলতে পার?’
ইস্কা চেঁচিয়ে জবাব দেয়, ‘ওর সাথে কে খেলবে?’
ফ্যান চলছে। তবুও মশা কামড়াচ্ছে। রানি বলল, তাকেও কামড়াচ্ছে। আমার মনে হলো, মশা না-ও হতে পারে, বা সন্ধ্যার ধূসর মশা।
রানি বিছানা ছেড়ে উঠে গেল। এখনই কয়েলের গন্ধ পাব। রানি দরজা বন্ধ করল, সিটকিনির শব্দ শুনলাম। কয়েল না জ্বালিয়ে বিছানায় এলো।
আমি বললাম, ‘জিমে গেলে ভালো লাগত।’
‘কেন?’
‘ঘাম ঝরাতে পারতাম।’
রানি আবার বলল, ‘আমাকে ছোঁও না কেন?’
আমি বললাম, ‘শূন্যপন্থা নিয়েছি। কিছু চাই না।’
দরজা ধাক্কানো ও কলিংবেল একসাথে চলছে। রানি উঠে গিয়ে খুলল। ইস্কা ফিরে এসেছে।
‘খেলব না।’
ওকে কনভিন্স করার জন্য উঠে কাছে গেলাম।
‘চলো ডিকটেশন পড়ি।’
ও রাজি হলো না।
কাল সকালবেলা পড়াতে বসলে আমার হাড়মাংস খাওয়াতে হবে। ও কম্পিউটারে বসে গেমস খেলতে শুরু করল। খেলায় মনোযোগ নেই।
রুমে ফিরে এলে রানি বলে, ‘দরজা আটকে দাও।’
‘কেন?’
রানি কিছু বলল না, ছিটকিনি তুলে দিলাম। নিচেরটা, উপরেরটা। বিছানায় শুলাম। রানি উদ্যোগ নিচ্ছে না। আমি চোখ বন্ধ করে কাত হয়ে আছি। দু-একটা প্রশ্নের হ্যাঁ-হুঁ জবাব দিচ্ছি।
দরজায় ঠকঠক। রানি দরজা খুলতে গেল। আমি বললাম, ‘দুটি সিটকিনিই আটকানো।’
চিন্তা রুমে ঢুকে বলল, ‘তোমরা দরজা বন্ধ করে কী করছ?’
আমরা কেউ উত্তর দিলাম না।
আমি কয়দিন থেকে দেশভাগের গল্প পড়ছিলাম। উঠে গিয়ে সেটা পড়তে পারি। না, জিমে যাব, ভাবছি। আমরা কেউ কিছু না-করে না-করে সাড়ে দশটা বাজিয়ে দিলাম। খাওয়ার পর্বও খাওয়া না-খাওয়ার মধ্যে শেষ।
আমি দুজনকে নিয়ে ঘুমাতে গেলাম। চিন্তা মারামারি শুরু করলে দুজনের মাঝখানে শুয়ে নিয়ন্ত্রণ করি। বলি, ‘যে আগে ঘুমাবে, সে কাল চকোলেট পাবে।’
ওরা দুজন খুব দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে।
আমি ভাবি, রানির বিছানায় যাব। আবার ভাবি, মনে আশা জাগছে কেন? আবার নিজেকে নিরাশায় পূর্ণ করে চোখ বন্ধ করি। রাতে এসে ডাকতে পারে। ডাকলে যাব, বা যাব না।
সকালে শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। লুঙ্গি সামলে বাথরুমে যাব, দেখি ভেজা। আমি স্মৃতি হাতড়ানোর চেষ্টা করলাম। মনে পড়ছে না। কোনো নারী—নাকি আপনা-আপনি কল থেকে পানি গড়িয়ে গেল! সে যাক্, এখন তৈরি হব দিনের মুখোমুখি হওয়ার জন্য।
ইস্কা অনলাইনে কোচিং করছিল। চিন্তাকে স্কুল থেকে আনার সময় হয়নি তখনও। চেয়ারে বসে রিলস দেখছিলাম। এক নারী তার সুঠাম পাছা থেকে সুতার মতো থং খুলছে। ক্যামেরা নিচ থেকে ধরা। কোনো সমুদ্রপাড়ে। বিরতিহীন কয়েকবার চলল। নিজেকে বললাম, ‘কেন?’
হোয়াটসঅ্যাপে একসাথে কয়েকটি মেসেজ এলো। নীলিমা সন্ধ্যায় আলিয়ঁস ফ্রঁসেসে থাকতে বলছে। আমি শুধু লিখলাম, ‘জানাব।’
আমি জানি, যাব না। আবার মনে হচ্ছিল, ওর সাথে রিকশায় ঘুরে ঘুরে শেষে জিম থেকে বাসায় ফিরলে ভালো হতো। অফিসে এসে লিখলাম, ‘আজ থাক।’
সন্ধ্যায় বেড়িবাঁধে হাঁটছিলাম। সিগারেট জ্বালালাম। ধুলায় চোখ-নাক বন্ধ হয়ে আসছে। সিগারেট ফেলে দিলাম। অটোরিকশাগুলো যেভাবে খুশি চলছে। কোথাও জট পাকিয়ে আছে। চারদিকে গালিগালাজ।
এরই মধ্যে এক কিশোরকে তিন-চারজন মিলে বক্সারদের মতো ঘুষি মারছে, লাথি মারছে। মুহূর্তে মানুষ জমে গেল। কেউ কেউ ভিডিয়ো করছে। কেউ মেরে ফেলার কথা বলছে। আমি সরে এলাম। কারো আঙুল থেকে গুলি বের হতে পারে, অথবা আধলা ইট এসে মাথায় লাগতে পারে। মব-কালচার সহনীয় হয়ে গেছে। মরে-মেরে সবাই আপাতত শান্ত থাকুক।
আমি নবনীতা হাউজিংয়ের ভেতর একটি নির্মাণাধীন বাড়ির সিঁড়ি বাইতে শুরু করলাম। সিকিউরিটি গার্ডরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছিল, শুনলাম না। গণপিটুনির সম্ভাবনা আছে। ফ্লোরে ইট ও রড ছড়িয়ে আছে। আমাকে আচ্ছামতো ছেঁচতে পারবে।
টপ ফ্লোরে উঠে দেখলাম, বাতাসে গাঁজার গন্ধ। উৎসের কাছে গিয়ে দেখি, নাক-মুখ ফেটে রক্তাক্ত এক কিশোর টানছে। আমি হাঁটুমুড়ে বসে হাত বাড়ালাম। সে নতুন স্টিক বাড়িয়ে দিল।
শেষ করে বললাম, ‘তুমিই কি ওই ছেলেটা? মার খাচ্ছিলে?’
সে উত্তর দিল না। আমি নিচে নামতে শুরু করলাম।
নামতে নামতে রাহনুমার কথা মনে পড়ছিল। কত সহজ ও স্বাভাবিক ছিল পরস্পরের সঙ্গে লেপ্টে থাকা। কেউ একা নই। কিন্তু রাহনুমা স্বপনের সঙ্গে বাঁচে। স্বপন ঘুমন্ত রাহনুমাকে বিছানা থেকে টেনে নামিয়ে সংগম করে। স্বপন আমার পেছনে তাড়া করছে। প্রায়ই ফোন করে এটা-সেটা বলে, ভয় দেখায়। আমার ওপর ক্রুদ্ধ।
রাহনুমা একশ চার জ্বরে কাঁপছিল। স্যালাইন চলছে। মধ্যরাতে স্বপন তার উপর চেপে বসে। গজার মাছের মতো পেনিস অনিচ্ছার ভেতর ঠেসে দেয়।
‘ভেবে দেখো, স্বপনকে আমার বিয়ে করতে হলো।’
‘তুমি করলে কেন?’
‘আমি করেছি? বাধ্য করল সবাই।’
‘বলতে, তুমি রেপড…’
‘শুনবে কে!’
রাহনুমা আমার সঙ্গে জড়িয়েছিল কি তারই শোধ নিতে? আমি জানি না।
রানিকে বিয়ের কথা যখন ভাবছিলাম, তখন রাহনুমা আমাদের সম্পর্কের কথা স্বপনকে বলে দেয়। স্বপন আমার ও রাহনুমার পরিচিত সবাইকে ফোন করে তা জানাতে থাকে।
আমার ফোন বেজে ওঠে। রিংটোন চেনা, তাই দেখিও না। আবার বাজে। আবার বাজে। ধরি। স্বপন।
স্বপন আমাকে কিছু বলার স্পেস না দিয়ে নিজেই বলতে থাকে। আমি ফোন পকেটে রেখে দেই। শুধু একটি কথা কানের মধ্যে বাজতে থাকে।
‘আমি এখনো দুইটা কনডম পরে সেক্স করি।’
আমি সিগারেট জ্বালাতে যাই। মুঠো ঘামছে। লাইটার দুই-তিনবার স্পার্ক করে। জ্বলে। লম্বা কয়েকটি টান দিই। ধোঁয়া ছাড়ার মধ্যে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায়।



