মহল্লায় শেয়াল ধরার আয়োজন চলছে। গত সপ্তাহে শেয়ালের চোয়ালে মাথার খুলি দেখা গেছে। মিয়া বাড়ির কম বেশি সবাই শেয়াল ধরতে ব্যস্ত। হঠাৎ শিয়ালপণ্ডিতের মাথা পছন্দ হলো কেন? মহল্লাবাসী কবরের ভেতর থেকে কিছুতেই শিয়াল বের করতে পারে না। একজন প্রবীণ উচ্চারণ করে, ধূমা দেও? ধূমা দেওয়া হয়। তারপরও শেয়াল বের হয় না। আরেক প্রবীণ উচ্চারণ করে, মরিচ পোড়া দেও। শেয়াল বের হইবো না, শেয়ালের বাপ বের হইবো। পোড়া মরিচের গন্ধ ইনজেকশনের মতো কাজ করে।
কবরস্থান সংলগ্ন সবার হাঁচি-কাশি ভেদ করে শেয়াল বের হয়। আসলে গন্ধ/টন্ধ কিছু না। কে মরতে চায়? শেয়ালের মৃত্যু শয়তানের মতো সত্য প্রমাণিত হয়। যুবকেরা শেয়ালটাকে মেরে মাথা থেঁতলে গরুর রানের মতন গাছে ঝুলিয়ে রাখে। দুষ্টু পোলাপাইন শেয়ালটাকে কবর দেয়। সেই কবরে শিয়ালশাহের মাজার লিখলে কৌতুকের সৃষ্টি হয়। স্কুলপড়ুয়া যুবতীরা আশেপাশের দু-চার গ্রামে এ ঘটনা রটিয়ে বেড়ায়। মহল্লায় শিয়াল নিয়ে মাতামাতির দিনগুলোতে কনকের একমাত্র পুত্র উচ্চমাত্রায় চিল্লায়। তার চিল্লানি শুনে পাশের ঘাটে গোসল করতে থাকা যুবতীরা গা মাজন বন্ধ করে-ছোটখাট বোমার শব্দের মতন হাসি দেয়। সেই হাসিতে আমগাছের নিচে এক পা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা বকের ধ্যান নষ্ট হয়। বিষয় কী? তেঁতুল গাছের নিচে মাছরাঙার শিকার করার আগে অথবা কাঠঠোকরোর খোঁড়লে ঢোকার পর কনকের পোলার টাকি মাছের ভগ্নাংশ জিপারে আটকায়। এই সময় সোনামিয়ার উঠোনে ঘুঘু ধান খাইতে নামে। পাখির নাম ঘুঘু হইলেও মহল্লার মানুষরা পাখিটাকে ডুহি বলে ডাকে। ঘুঘুরে কেবল ডুহি বলে না। শালিককেও হাইলকা বলে। হাইলকা-শিকারি দেখা না গেলেও ঘুঘু শিকারি দেখা যায়। খাঁচার ভেতর একটা বন্দি ডুহি দিয়ে ফাঁদ পাতা হয়। ডুহি তার পরিচিত নাগরকে অথবা নতুন কোনো হাঁদারামকে বুলায়। ডুহির মোলায়েম সুর শুনে যে পটেছে তার কপালে ছুরির পোঁচ-ভিন্ন দ্বিতীয় কোনো বিকল্প থাকে না। কেউ ডুহি খরিদ ক’রে পুষেছে, এমন খবর পাওয়া যায় না। কোনো এক অগ্রহায়ণে ডুহি শিকারি তার প্রতারক ঘুঘুটাকে নিয়ে মিয়া বাড়ির মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া খালপাড়ে আসে। শিকারি পল্লী বিদ্যুৎ-এর খুঁটির সঙ্গে প্রতারক ঘুঘুটাকে প্রতারণার জন্য প্রস্তুত করে।
সেই সময় ঝাঁকিজাল লইয়া সোনামিয়া মাছ ধরতে বের হয়। মিয়া পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লেও, মাছ ধরার সময় তার লুঙ্গির গোছ বিকিনি হইয়া যায়। তা দেখে সহমৎস্যশিকারিরা টিটকারি মারে। মিয়ার বিকিনির মতন গোছ মাছ ধরার কোনো কৌশল হইতে পারে। সোনামিয়া পরিশ্রমী মানুষ। ‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’-র বুড়ার চাইতেও বেশি পরিশ্রমী। সে মাছ ধরতে আইসা পক্ষী শিকারিকে দেখে। শিকারিকে দেইখা মনে মনে ভাদাইম্মা বইলা গাইল দেয়। সোনামিয়া কেবল চারটা পুঁটি ধরতে পারে। ডুহি শিকারি কোনো পক্ষীকে বিভ্রান্ত করতে পারে না। খাল-বিল থাইকা মাছ পূর্ব পুরুষের মতন হইয়া গেছে। মিয়া জোয়ান কালে যেই মাছ ধরছে, নাতিপোতির কাছে কইলে তারা গপ বইলা উড়াইয়া দেয়। বুড়া মিয়া মাছের আশায় শরীরে সোয়া দুই ঘণ্টা রইদ লাগাইলেও ডোলায় উল্লেখ করার মতন কোনো মাছ সংগ্রহ করতে পারে না। এজন্য তার আক্ষেপ নাই। মিয়া জাল ধোয়ার নামে মসজিদের জন্য বরাদ্দ পুকুরে জাল ফেলে। সেই দৃশ্য টুপিওলা বদু দেখে মনে মনে এই বলে শান্ত হয়, কাক্কুর এক ঠ্যাং কবরে এইটা কী করল! বদরুল এই দৃশ্য প্রথম দেখছে তা-না। সোনামিয়া খাল-বিলে মাছ না-পাইলে এই কাজ করে। সে ডোলার ভেতর চারটা পুঁটি এবং খুটে যুবতি রুই মাছ লইয়া ঘরে ঢোকে। এই সময় মিয়ার বিকিনি গোছ কিছুটা শালিন হয়। সে ঝাঁকিজাল উঠানে বিছাইয়া দেয়। তখন তার বউ পাকঘরে রান্না করে। মিয়া খুট থাইকা যুবতি মাছটা তার বউয়ের হাতে দিয়া কয়, ভালা কইরা পেঁয়াজ দিয়া ভাজবি। তার বউ খ্যাঁক কইরা ওঠে। কবরে যাওনের সময় হইছে, অহনও হুঁশ হয় না! যাও মাছটা গিয়া পুকুরে ছাইড়া দিয়া আসো। উল্টাপাল্টা কথা কইবি না। তুই সর। আমি রানমু। মিয়ার লুঙ্গি চুয়ে পানি পড়ে। দূর থাইকা দেখলে মনে হয় বুইড়া মুইত্তা দিছে। মাছ রান্নার সময় মিয়ার ভেজা লুঙ্গি শুকাইয়া যায়। তার শিশুতোষ রান্নায় যুবতি রুই মাছের বিশেষ স্বাদ থাকবে কি? তখন উমের মুরগিটা কক কক...করে। বুড়ি বুড়ার সঙ্গে রাগ করছে। এই বুড়া সুফিয়ারে শুধু সন্তানই দিছে। মিসেস সোনার মনে পড়ে জোয়ানকালে এক কাপড়ে দিন কাটানোর কথা। বাপের বাড়ি থাইকা কাপড় আইনা পরছে। তখন কেউ আছিল না। যদিও বুড়া এবং বুড়ি নিঃসঙ্গতা যাপন করে। তাদের ৫ ছেলে ৪ মেয়ে। ২টা ছেলে ম’রে ভালোই করেছে। তার মেয়েরা জামাইয়ের বাড়িতে ভালো আছে অথবা নেই। পোলাপাইনডি হচ্ছে মাইগ্যা। শুধু বউয়ের কথা শোনে। বিকিনি বুড়োর ঝাড়ি খাইয়া সুফিয়া বেগমের মাইগ্যা পোলাপাইনের কথা মনে পড়ে। বুড়ি পোলাপাইনের নাম লইয়া বিলাপ পাড়ে। বুড়ির বিলাপ শুইনা উমের মুরগিডা কক-কক থামাইয়া দেয়। মুরগিরও কি মন আছে? সুফিয়া বেগমের বিলাপের দৈর্ঘ্য বাড়ে। তার আয়ুসের রাতা মুরগিডা আইরলে নিয়া গেছে। সুন্দরী নাতনি বেড়াইতে আইলে ভাবছিল রোস্ট করবো। কী থেকে যে কী হয়ে যায়! মানুষ অনেক কিছুই আশা করে। কয়টা ডিম পাখি হইতে পারে?
বিকিনি বুড়ার বাড়ির পাশেই বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড় এক সময়ের বনের সংস্করণ। বাঁশঝাড়কে তারা ডেঙ্গা বলে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। এখন আর কেউ ডেঙ্গায় হাগে না। বাড়িঘর উইঠা ডেঙ্গা নেড়া হইয়া গেছে। মাগরিবের আজানের পর চোখ নষ্ট করা পল্লী বিদ্যুৎ-এর প্রাণ ৬০ ওয়াটের বাল্বে গ্রামের সরকারি ডাক্তারের মতন থাকলে থাকে, না-থাকলে নাই। বুড়োর বাড়ির পেছনে বাঁশঝাড়। ঝিল্লির সুর অন্ধকারে রাতের সংগীত। বাঁশঝাড়ের পাশেই মুরতাকের ঝোপ। তার পাশেই পানা পুকুর। অঞ্চলটা এখনও ভান করা শেখেনি। ঝোনাকির আলোকসজ্জায় চারপাশ চিকচিক করে। চাঁদের নরম আলো তুষারের মতো ফরসা কিন্তু কুয়াশার মতো ঘোলা। পানা পুকুর থেকে একটা বিবাগি ঘ্রাণ ঘুরে বেড়ায়। সোনামিয়া একবারে এশার নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে ফেরে। কেরোসিনের দাম আর অ্যালকোহলের দাম এক হয়ে যাবে না-কি? কেরোসিন বেশি পুড়তে দেওয়া যাবে না। সুফিয়া বলে, ভাত বাড়ছি। হ্যারিকেন মিটমিট করে জ্বলে। তারা লাল চালের ভাত নিয়া বসে। সোনামিয়া তার রান্না করা মাছের টুকরা পাতে নেয়। তার বউ লবণ দিয়ে ভাত মাখে। সোনামিয়া বুড়ির পাতে এক টুকরা মাছ তুলে দেয়। সুফিয়ার প্রতিক্রিয়া বোঝার আগে কেরোসিনের অভাবে হ্যারিকেনটা নিভে যায়।

