এআই
অমল চক্রবর্তী
Writer
আত্মজীবনী এবং সংবেদনশীল প্রেমের কবিতার জন্য তিনি বিখ্যাত।১৯৭১ সালে সাহিত্যের নোবেল বিজয়ী নেরুদা চিলির জাতীয় কবি হিসেবে বিবেচিত। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাকে ‘যে কোনো ভাষায় বিশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি’ বলে অভিহিত করেছেন। হ্যারল্ড ব্লুম তার ‘দ্য ওয়েস্টার্ন ক্যানন’ গ্রন্থে নেরুদাকে পশ্চিমা ঐতিহ্যের কেন্দ্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
কেন যেন স্প্যানিশ ভাষার আর সব মহান কবিদের তুলনায় নেরুদাকে বেশি কাছের মনে হয়! তার দ্রোহ ও চরম আত্মনিবেদনের কবিতা তাকে বাঙালি মননের খুব আপনজন করে তুলেছে।
কেন যেন স্প্যানিশ ভাষার আর সব মহান কবিদের তুলনায় নেরুদাকে বেশি কাছের মনে হয়! তার দ্রোহ ও চরম আত্মনিবেদনের কবিতা তাকে বাঙালি মননের খুব আপনজন করে তুলেছে। ১৯২৩ সালে চিলির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এদিসিওনেস ক্লারিদাদ তার প্রথম গ্রন্থ ‘Crepusculario’ (বাংলায় : গোধূলি) প্রকাশ করে।
১৯২৪ সালে সান্তিয়াগোর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এডিটোরিয়াল ন্যাসিমেন্টো প্রকাশ করে তার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘ভিন্তে পোয়েমাস দি আমোর ইউনাক্যানসিওন দেসেসপেরেদা’ (কুড়িটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান)। প্রেমের কবিতাগুলো উদ্দামতা ও বেআব্রু শব্দচিত্রের জন্য বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, বিশেষত লেখকের বয়স বিবেচনা করে। এরপর কয়েক দশকে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ভিন্তে পোয়েমাস দি আমোর ইউনাক্যানসিওন দেসেসপেরেদা’ কয়েক মিলিয়ন কপি বিক্রি হওয়ায় সেটি নেরুদার সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা হয়ে ওঠে। প্রায় একশ বছর পরেও কাব্যগ্রন্থটি স্প্যানিশ ভাষায় সর্বাধিক বিক্রি হওয়া কাব্যগ্রন্থের রেকর্ড ধরে রেখেছে। আধুনিক লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে ডেভিড পি গ্যালাগার লিখেছিলেন, ‘ভিন্তে পোয়েমাস দি আমোর ইউনাক্যানসিওন দেসেসপেরেদা’-তে নেরুদা একটি আদর্শ বন্দরের সন্ধানে প্রতীকীভাবে সমুদ্রের ওপারে ভ্রমণ করেছেন’।

১৯৪১ সালে নেরুদা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। রাজনৈতিক জীবনের শীর্ষে পৌঁছে তিনি রাষ্ট্রপতির জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। নেরুদার জনপ্রিয়তা এমন ছিলো যে, সশস্ত্র বাহিনী সমর্থিত পিনোশেট সরকার নেরুদার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে সর্বজনীন অনুষ্ঠানের অনুমতি না দিলে হাজার হাজার শোকাহত চিলিয়ান কারফিউ অমান্য করে রাস্তায় ভিড় করেছিল।
নেরুদা কবিতা লিখে বিপদের মুখেও পড়েছেন, ১৯৪২ সালে তিনি স্ট্যালিনগ্রাদ নিয়ে একটি অসাধারণ কবিতা লিখে মেক্সিকো থেকে বহিষ্কৃত হন। কবিতার শুরুটা এমন:
আমি সময় এবং জল সম্পর্কে লিখেছিলাম,
এর শোক এবং বেগুনি ধাতু লিখেছিলাম,
আমি আকাশ এবং আপেল সম্পর্কে লিখেছিলাম,
এখন আমি স্ট্যালিনগ্রাদ সম্পর্কে লিখছি।
কনে ইতোমধ্যে তার রুমাল মধ্যে রেখে দিল
প্রেমে আমার ভালোবাসার রশ্মি,
এখন আমার হৃদয় মাটিতে আছে,
স্ট্যালিনগ্রাদের ধোঁয়া এবং আলোতে।
এই কবিতায় সহজেই প্রতিভাত হয়, রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যেও নেরুদা তার শৈলী ধরে রেখেছেন। এমনকি সরাসরি লেখা রাজনৈতিক কবিতাও প্রেম বিবর্জিত নয়। নেরুদা তার প্রিয়তমাকে উপহার দেবে একটি গ্রেনেড যার নাম ‘স্ট্যালিনগ্রাদের জন্য প্রেমগাথা’:
তোমার মাটি থেকে শস্যের আনা লাল শীষে,
যদি কোনও সন্দেহ থাকে, জেনে নাও নিশ্চিত
আমি তোমাকে ভালোবাসি এবং তুমি আমাকে,
আর যদি তোমার কোমরে লড়াই না করতাম
রেখেছি তোমার সম্মানে এই কালো গ্রেনেড,
স্ট্যালিনগ্রাদের জন্য ভালোবাসার এই গান।
এই দীর্ঘ কবিতাটি নেরুদা গান গেয়েও শুনিয়েছেন। আসলে নেরুদার কাছে বিপ্লবের অপর নাম প্রেম। নেরুদা সবসময় সবুজ কালি দিয়ে লিখতেন, এটি ছিল তার কাছে আশাবাদের রং। বিপ্লব তার কাছে আশার প্রতীক। লোরকা, অক্টাভিও পাজ, লোপে দা ভেগা, হিমেনিস, লুইস বোর্হেস, ওসি মার্তিসহ অন্যান্য স্প্যানিশ মহান কবিদের সঙ্গে নেরুদার নামও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। রাজনৈতিক কবি নয়, মূলত অশান্ত, উত্তাল, আবেগে বেগবান কবি হিসেবে তিনি অমর। অতি সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ‘মি-টু হ্যাশ ট্যাগ’ আন্দোলনে পাবলো নেরুদা, মার্ক্স-সহ আরো অনেক লেখক ও কবিকে জড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে শুধু এটাই বলা শ্রেয়, নেরুদার মতো প্রথাবিরোধী একজন কবির ব্যক্তিজীবন ও কবি-জীবনকে এক করার চেষ্টা না করাই শ্রেয়। আর তার যে প্রাণোচ্ছলতা, মানসিক উদ্বেলতা, এবং যে জটিলতার মধ্য দিয়ে তিনি গিয়েছেন, তা ২০১৯ সালের আবহাওয়ায় বিচার করা কতটুকু সংগত?