রেখে যাওয়া লোকটির নির্দেশমতো আমরা হাঁটতে শুরু করি। পাহাড়ের গা বেয়ে সরু পথ, যতই হাঁটি ততই উপরে উঠি, যেন মেঘের দিকে যাত্রা। দুই পাশে অফুরন্ত সবুজ আর অবিশ্রান্ত ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক--গাছের ভেতর দিয়ে ভ্যাপসা গরমের আভাস গায়ে লাগে। স্পেনীয় গ্রীষ্ম ভারতীয় উপ-মহাদেশের গ্রীষ্মের কথা মনে করায়। হাঁটতে হাঁটতে কখনো হটাৎ চারপাশ এতো নীরব হয়ে যায় যে, নিজের জুতোর শব্দ শুনতে পাই। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া বিদেশি বুনো ফুলের সৌরভ আমাদের ইন্দ্রিয়গত করে। কতদিন পর যে বুনো ফুলের ঘ্রাণ পেলাম তার ইয়ত্তা নেই। ইউরোপের ফুলেরা কেবল চোখের দেখার, সুরভী মেলে শুধু কারখানায় বানানো সুগন্ধি-জলে।
কিলোমিটার পাঁচেক হাঁটতে হয় ক্যাম্পিং-স্থলে পৌঁছাতে। ইউরোপে ইচ্ছেনুযায়ী যেখানে সেখানে ক্যাম্পিং-এর সুযোগ নেই। আগে থেকে অনুমতি নিয়ে কিংবা অথবা সরকার নির্ধারিত স্থানেই শুধু তা সম্ভব। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্য মাথার ওপরে চলে আসে। সকলেই ঘেমে নেয়ে একাকার। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, পরিশ্রান্ত একইসঙ্গে। তবুও যেন সেদিকে কারও খেয়াল নেই। পৌঁছেই আমাদের তাবু দেখিয়ে দেওয়া হয়। তাবুর ভেতরে যাওয়ার আগে চারপাশটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া চাই।
তিন পাহাড়ের মাঝখানে ক্ষুদ্র উপত্যাকার উপর গাছাপালা কেটে ক্যাম্পিং-এর জায়গা করা। চারপাশ পাহাড় দিয়ে ঘেরা--পাহাড়ের গায়ে গায়ে স্টোন পাইন আর নানা রকম অচেনা গাছের সারি, তাদের ভেতর দিয়ে ঝিঁঝিঁ পোকা আর পাখিদের অনবরত কোলাহল। রকমারি ফুলের সৌরভে পুরো এলাকা মাতোয়ারা। ওপরে সুনীল আকাশে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে মেঘেরা। তাবুর মাত্র কয়েকশ গজ দূরে পাহাড় নেমে গেছে ৭০-৮০ মিটারের মতো খাদ হয়ে। দুই পাহাড়ের ভাঁজের ভেতরে বয়ে গেছে খরস্রোতা নদী। পরে জানতে পারি নদীর নাম মুগা।

আমরা যেখানে তাবু করেছি সেখানে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডের লোকেরাও তাবু গেড়েছে। পুরো ক্যাম্পিং এলাকার জন্য পাহাড়ের গা ঘেঁষে এককোণে কিছুটা আধুনিক কায়দায় কতগুলো সারিবদ্ধ শৌচাগার আর স্নানঘর নির্মাণ করা। তার অদূরে রসুইঘর বা পাকশালার চিহ্ন সংবলিত বড়ো খোলা এক তাবু। আমাদের বলা হলো সেখান থেকেই সারি ধরে দাঁড়িয়ে খাবার ও পানি সংগ্রহ করতে হবে। দিনের ভেতর সকালে এবং সন্ধ্যায় দুইবার খাবার পরিবেশন করা হবে। দুপুরে যেহেতু খাবারের সুযোগ নেই তাই সকালের খাবার থেকে কিছুটা দুপুরের জন্য তুলে রাখতে হবে। আশে-পাশের পাঁচ-সাত মাইলের মধ্যের কোনো খাবারের দোকান নেই যে সেখান থেকে খাবার কেনা যাবে। রসুই ঘরের কাছে গিয়ে রান্নাবান্না সহ পুরো ক্যাম্পের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়জিত বিভিন্ন রঙের একদল চৌকস বিদেশী লোকের দেখা পেলাম। যে কোনো প্রশ্ন করলেই তারা মুচকি হাসি দিয়ে উত্তর দেন। সদ্য পৌঁছেছি বলে আমরা সে বেলা বিভিন্ন শাকসবজির সংমিশ্রণে রান্না সালুন এবং স্যুপের মধ্যবর্তী একটি খাবার পেলাম। তাতে না হয়েছে লবণ, না আছে উষ্ণতা। আর হলুদ-মরিচের কথা ইউরোপের খাবারে মনে করাই তো বাহুল্য। চোঁ-চোঁ পেট তবু অল্পক্ষণেই হেসে ওঠে। পাহাড়ের ঝর্ণা-জলের তুলনা নেই। বুক ভরে পান করা যায়।
খাওয়া শেষে আর কিছু করার শক্তি থাকে না বলে আমরা তরুণ চেরি গাছদের ছায়ায় গোল হয়ে বসে তাস খেলি।
পরদিন থেকে শুরু হয় পাহাড়ের গায়ে আমাদের নতুন নতুন আবিস্কার। আমরা যে এলাকায় রয়েছি তাকে ডাকা হয় বাসেগোডা পার্ক নামে। স্থানীয়দের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, পাহাড়গুলোর নাম আল্টা গ্যারাটক্সা (Alta Garrotxa)। মূলত এই পাহাড়গুলো স্পেনের উত্তর দিকে ফরাসি দেশের সীমান্তে অবস্থিত পিরিনীয় পর্বত-শ্রেণির অংশ। এই পর্বত-শ্রেণির মধ্য দিয়েই ফ্রান্স ও স্পেনের বিভাজন রেখা চলে গেছে। এই পর্বতমালাটির অভ্যন্তরে পৃথিবীর ষষ্ঠ ক্ষুদ্রতম দেশ অ্যান্ডোরা অবস্থিত। অ্যান্ডোরা যাওয়ার গল্প অন্য এক লেখায় কখনো করা যাবে।
জানতে পারি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮ শত ফুট উচ্চতায় আমাদের যেখানে ক্যাম্প তার কিছুটা কাছে পাহাড়ের মধ্যে ছোট্টো একটি আবাসিক হোটেল অবস্থিত। সেই হোটেল সংলগ্ন ছোটো ভলিবল মাঠ এবং সুইমিং পুল বা নীল জলের শান বাঁধানো পুকুরটি আমাদের ব্যবহারের জন্য অনুমতি নেওয়া আছে, চাইলেই আমরা সেখানে যেতে পারি। কৌতূহলে এক-দুই বার সেখানে যাইও। দলের অধিকাংশই পুল আর মাঠে বেশি সময় কাটায়। কিন্তু আমার মতো কয়েকজনের তাতে যেন মন নেই--এতো পথ পাড়ি দিয়ে কাতালোনিয়ার পাহাড়ে এসে যদি সেই ইট-কাঠের শহুরে ঘটনায় আবদ্ধ থাকি, তাহলে আসার কী অর্থ হলো? কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিই এলাকা ঘুরে দেখবো।
প্রথম আগ্রহ মুগা নদীকে ঘিরে। কিন্তু আবশ্যিক নিয়ম হলো, দলের কেউ যদি আলাদা কোনো পরিকল্পনা করে তবে সবকিছুই প্রথমে আমাদের দলের প্রধান এবং পরে ক্যাম্পিং-এর আয়োজকদের জানাতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী তাদের জানানো হয়। তারা বলেন, এই সাতদিনের কোনো একদিন ক্যাম্পের আয়োজকের পক্ষ থেকে একটি চৌকস বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তায় আমরা মুগা নদী ট্রেকিং করার সুযোগ পাবো। নিজেরা একাকী যেন আমরা এই নদী ধরে কোথাও না যাই। কারণ সরু পাহাড়ি-পাথুরে এই নদীর তলদেশের পাথর কিছু কিছু স্থানে খুব পিচ্ছিল, কিছু কিছু স্থানে গভীর খাদ। পিছলে পাথরের গায়ে ধাক্কা খেলে খুব খারাপ কিছু হতে পারে। যারা এই নদী ভালো চেনে তাদের সঙ্গে করে না গেলে আমরা যে কোনো সময়ই বিপদে পড়তে পারি। আমরা তবু নদীর কাছে যাই। সুস্বাদু জলে ভরা নদী, বড়ো বড়ো প্রাচীন পাথরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে।
ওয়াটার ট্রেকিং-এর দিনেও মুগা নদীকে নিয়ে আমাদের উত্তেজনার অন্ত ছিলো না। সবাইকেই হেলমেট আর নেওপ্রিনআনসুগ (জার্মান: neoprenanzug) নামে এক ধরণের নিউপ্রিন, রবার বা সিন্থেটিকের স্যুট বাধ্যতামূলকভাবে পরতে হয়। সঙ্গে কাপড়ের জুতো। যেহেতু পাথুরে পিচ্ছিল সরু খরস্রোতা নদী, সে কারণেই এই প্রস্তুতি। তারপরও একবার পড়ে গিয়ে কনুই ছিলে যাওয়া রক্ষা করতে পারিনি।

যাত্রা শুরু হয় ক্যাম্প থেকে উত্তরে মুগা নদীর প্রশস্ত অগভীর স্থান থেকে। জলের গভীরতা সেখানে হাঁটু থেকে কোমর অব্দি। আমরা হাঁটতে শুরু করি নদীর মাঝ বরাবর। অধিকাংশ স্থানে নদীর কোনো পাড় নেই-- দু’ পাশে পাথুরে পাহাড় খাড়া উপরে উঠে গেছে, প্রায়ই মনে হয় দুই পাহাড়ের চিড়ে আমরা। পাহাড়ের মধ্যকার ফাটল ধরে বয়ে চলা নদীতে কেবলই পাথর। কোথাও সহসা সুগভীর, কোথাও অগভীর। কোথাও পিছলে যেতে হয় বৃহৎ পাথরের উপরে। কোথাও লাফ দিয়ে তলিয়ে যেতে হয় দশ-বিশ হাত। স্রোতস্বিনীর ভেতরে বড়ো-ছোটো মাছের দেখা। চারপাশে পাখি আর ঝিঁঝিঁর অবশ্রান্ত ডাক। কিছু কিছু স্থানে নদীটি ঝর্না আঁকারে গড়িয়ে পড়েছে। সেখানে পানির গতিতে সতর্কতা নিয়ে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। ঝর্না-আকারে জল পড়া এমন কিছু প্রশস্ত স্থানে আমরা দেখা পেয়েছি স্পেনীয় বালক বালিকাদের, তারা পাহাড়ের উপর থেকে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় পানিতে লাফিয়ে পড়ছে আর তাদের ভাষায় বিভিন্ন শব্দের ফুলঝুরি ছড়াচ্ছে। উঁচু থেকে গভীর জলে আমাদের লাফিয়ে পড়া দেখে তাদেরকে সমচ্চরে গান গাইতে শুনি। আমাদের দলে ব্রাজিলের যে শিক্ষার্থী ছিলো, তার মাতৃভাষা পর্তুগিজ, স্পেনীয় ভাষায় বিশেষ পারদর্শী। তার কাছ থেকে পরে জানতে পারি, স্পেনীয় বালক-বালিকারা আমাদের উদ্দেশ্যে যে গান করেছিলো তা ছিলো মূলত কাতালান ভাষায়; তাতে তারা আমাদেরকে দুর্বল আখ্যা দিয়ে গান আকারে কিছু শব্দ বলেছে। একথা জানার পরও কোনোভাবেই মনের উৎফুল্লতা কমেনি। মুগা নদীর সবুজ-স্বচ্ছ জল বেয়ে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার ট্রেকিং শেষে আমরা ফিরে আসি ক্যাম্পে। অবসরে মুকুরিত হওয়ার মতো নতুন গল্পে আমাদের জীবন মেখে যায়।
পাহাড়ে ক্যাম্পিং-এর অন্য একদিন সুযোগ হয় আয়োজক দলের তত্ত্বাবধানে মাউন্টেন-বাইক বা পাহাড়ের জন্য বিশেষ সাইকেল সফরে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মতো সফরে পাহাড়ের বনরাজির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে অনেক রকমের ফুল ও গাছের দেখা পেয়েছি। বুনো মুরগি, ধূসর রঙের বরাহ শাবক আর হরিণদল ছাড়া আর কোনো বুনো জন্তুর সাক্ষাৎ সে যাত্রায় পাওয়া যায়নি। এদিককার পাহাড়গুলোর মাটি কিছুস্থানে এঁটেলজাতীয়, অনেকাংশে পাথুরে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ক্ষুদে ক্ষুদে গ্রাম। তারা আদিবাসী কিনা জানতে পারি না, তবে পাহাড়ের উপত্যাকায় তাদের রচিত গম আর অলিভের শস্যচিত্রিত ভূমি আমাদের মস্তিষ্কে অচেনা সবুজের স্বাদ রাখে।
ক্যাম্পিং-এর স্থান থেকে পাহাড়ের যে চূড়া দেখা যায়, একবার খুব ইচ্ছে হয়েছিলো সেখানে যাওয়ার। পর্যটক তত্ত্বাবধায়ক দলের সে বিষয়ে কোনো আয়োজন তালিকায় নেই বলে আমরা ছয় জনের একটি দল করে নিজেরাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত করি। আয়োজক দলের কাছ থেকে কয়েকটি স্থানীয় কাগজের মানচিত্র ছাড়া আর কোনো সহায়তা মেলে না। পাহাড়ে প্রায় অনেক স্থানেই মোবাইলের কোনো নেটওয়ার্ক না থাকায় ইন্টারনেটের সাহায্য পাওয়াও অসাধ্য হয়ে পড়ে। তবু যাত্রার নকশা করি-- আনকোরা বলে পিছু হাঁটা পথে যাওয়া যেন আমাদের ধাঁতে নেই। মানচিত্র অনুসারে পাহাড়ি বনের ভেতর দিয়ে যেখানে রাস্তা থাকার কথা সেখানে রাস্তার বদলে দেখতে পাই বন-জঙ্গলের ফাঁকে আলপথের মতো পথের নিশানা। পথ ধরে হাঁটতে থাকি। প্রত্যেকের কাছে কয়েক লিটার করে পানি আর কিছু ফল-ফলারি। বনের ছায়ার ভেতর রকমারি পতঙ্গ মাঝে মাঝে গায়ে এসে পড়ে, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে কান ঝালা-পালা হওয়ার উপক্রম। এসবের সঙ্গে বনের ভেতরে ভ্যাপসা গরম। মাথার ওপরে বড়ো বড়ো পাইন গাছের মাথায় দারুণ বাতাস বইতে দেখি; কিন্তু সে বাতাস ঘন পত্ররাজি আর গুল্মজাতীয় গাছদের ভেদ করে আমাদের কাছে পৌঁছায় না। অগত্যা ঘামে ভিজে জবজবে হতে হয়। এদিকে জামা খুলে ফেলবো সেই উপায়ও নেই--সরু পাহাড়ি পথের দু’পাশে কন্টকযুক্ত ছোটো ছোটো উদ্ভিদ। তাদের সংস্পর্শে এলেই শরীরে সূক্ষ্ম আঁচড় পড়ে যায়। কাতালোনিয়ার পাহাড়ে ওক গাছের দুই রকম প্রজাতি চোখে পড়ে। এই দুই প্রজাতিরই পাতা ওক গাছের মতো অবিকল, কিন্তু পাতার নিচের অংশ সাদাটে, আঁকারে ছোটো--গাছগুলো ঝোপ আঁকারে বড়ো হয়, তবে বেশি বাড়ে না। এক প্রজাতি কাঁটাযুক্ত, অন্যটা কাটামুক্ত। যতই উপরে উঠি ততই তাদের আধিক্য দেখি। এক পর্যায়ে গাছের ঘনত্ব কমে আসে, পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় চারপাশের পর্বত-শ্রেণির নয়াভিরাম দৃশ্যে। যতদূর চোখ যায় শুধু কাতালোনিয়ার পর্বত-শ্রেণির সবুজ চোখে পড়ে। যতই উপরে উঠি ততই পথ আরও বন্ধুর হয়, পাথুরে পথে হেঁটে ওপরে উঠা বেশ কঠিন--সতর্ক না হলে গড়িয়ে পড়ার ভয় আছে। একবার গড়িয়ে পড়লে কয়েক’শ মিটার নিচের খাদে। প্রায় ঘণ্টা তিনেক হাটার পর মানচিত্র আমাদের বলে কিংবা আমরা দেখতে পাই, পাহাড়ের চূড়া আমাদের পায়ের নিচে। বিশাল নিঃশ্বাস ফেলি! প্রায় ১৫’শ ফিট! একেবারে উপরে পাথরের ফাটলে ঘাস আর গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ছাড়া আর কোনো সবুজের দেখা নেই। চূড়ার দিকে মাটি নেই বললেই চলে। কেবল বিশাল বিশাল পাথর। অবাক হয়ে তাদেরকে দেখি আর ভাবি, কত হাজার বছর ধরে এইখানে পাথরেরা এভাবে নিটল হয়ে রোদের সঙ্গে কথা বলে! একেবারে উপরে উঠে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমাদের ফিরে আসার পালা। দলের সিদ্ধান্ত হয়, যে পথে আমরা এসেছি সে পথে ফেরা হলে একঘেয়ে লাগতে পারে, তাই আমরা অন্য পথ ধরে এগোই। পথে যে কয়েকবার পাহাড়ি ঝর্ণা-বিশিষ্ট সবুজ-নীল জলের হ্রদ পড়েছে, প্রতিবারই তাতে ভিজে এসেছি। বনের ভেতরকার পাহাড়ি পথে আমরা মাত্র একবারই পথ ভুল করেছিলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার--এই গহিন পাহাড়ের উপরের দিকে, ঘন বনভূমির ভেতর পাথর ছাড়া যেখানে কোনো মানুষের দেখা নেই, সেখানে পাথরের গায়ে কিছু পরে পরে হাতে আঁকা হলুদ রঙের ছোট ফোটা দিয়ে পথের নিশানা করা। চলতে চলতে পথের দু’ধারে পড়ে বুনো আপেল গাছের সারি। বরই-সাদৃশ্য আপেলগুলো পেকে টইটুম্বুর হয়ে আছে-- সেসব খাওয়ায় ব্যস্ত বাংলাদেশে খাঁচায় কিনতে পাওয়া বাজিগর বা লাভবার্ড পাখির মতো নানারঙা ছোটো ছোটো পাখি। কাছে গেলেই কিচমিচ করে তারা উড়ে যায়। পথে ফিরতে ফিরতে কর্সাবেই পাহাড়ের গায়ে দেখা মেলে Sant Martí de Corsavell নামক রোমান আমলের বহু পুরাতন মন্দিরের। জানা যায় ১ হাজার ১৯ সালে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত। বহু আগে থেকেই এই পাহাড়ে মানুষের বসবাস। আমরা এগিয়ে যাই, সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই ক্যাম্পে ফিরতে হবে--বিশ্রামের অবসর নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে কেবল নিচের দিকে নামছি, তবু পথ শেষ হয় না। দলের সবার শরীরের জোর কমে আসে, পায়ের পাতা আর হাঁটুতে কোনো অনুভূতি অবশিষ্ট থাকে না।

আমাদের ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে যায়-- ফিরে দেখি ক্যাম্পের সবাই আমাদের নিয়ে চিন্তিত। তবে সবকিছু পেরিয়ে এমন একটা দিনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার কারণে নিজেকে একবার আয়নায় দেখতে ইচ্ছে করে। মানচিত্র অনুসারে প্রায় ৭ ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটারের কিছু বেশি পাহাড়ি পথ আমরা পাড়ি দিয়েছি।
ভলিবল খেলা, পাহাড়ী ঝর্ণা ও মুগা নদীর জলে স্নান, হ্রদে ঝাঁপাঝাঁপি আর রাতের বেলায় পাহাড়ের উপরে ঘাসের ভেতর শুয়ে ঘন অন্ধকারে ১৮০ ডিগ্রি আকাশে তারা দেখে গোপনে একটি সপ্তাহ কীভাবে যে পার হয়ে যায় তা টের পাইনি। স্পেন সফরে সঙ্গে কিছু বই নিয়ে গিয়েছিলাম। দুপুরের অবসরে চেরি গাছের ছায়ায় বসে কিংবা শুয়ে পড়তে খুব ভালো লাগতো। কখনো গহিন রাতে তাবুর জানালা খুলে ঝিরঝির হাওয়ার ভেতরে মুঠোফোনের আলোতে যখন বই পড়তাম তখন প্রায়ই মনে হতো জীবন এক বিস্ময়। সে বিস্ময়ের ঘোরে কখনো শুনতে পেতাম পাশের খাদের ভেতরে মুগা নদীর জল নেমে যাওয়ার শব্দ--কখনো অচেনা দেশের অচিন রাতজাগা পাখির মধুকরী কণ্ঠ। জীবন কত যে ধ্রুপদী হতে পারে, পাহাড়ের সেই দিনগুলো ভেদ না করলে কখনোই বুঝতে পেতাম না।
এক সপ্তাহ পর আমরা পাহাড় ছেড়ে কোস্টা ব্রাভার সমুদ্র উপকূলে চলে আসি। লা’ স্কালা শহরের কাছে আমাদের ক্যাম্প। এখানেও আগের ক্যাম্পের মতো তত্ত্বাবধায়ন ও রক্ষনাবেক্ষনের জন্য একদল লোক নিযুক্ত। তারাই আমাদেরকে স্বাগত জানায় এবং তৈরিকৃত তাবু দেখিয়ে দেয়। সারি সারি বুড়ো ঝাউগাছের নিচে ভূমধ্যসাগরের তীরে ধুলোর মধ্যে আমাদের তাবু। বাতাসে জলের গন্ধ। পাহাড় আর সমুদ্রের মধ্যে পার্থক্য অসীম। রহস্যময় পাহাড় ছেড়ে সমুদ্র কতটুকু ভালো লাগবে তাই ভাবতে থাকি। তবু ভূমধ্যসাগর বলে কথা! পৌঁছেই রওনা করি সমুদ্রের দিকে। চলার পথে মাথার ওপরে উড়ে যেতে দেখি নানা বয়সের গাঙচিলদের। সমুদ্রতীরে গিয়ে আশাহত হতে হয়, একি সমুদ্র? ঢেউয়ের বালাই নেই! সমুদ্র জানে না, আমার মনে গাঁথা আছে বঙ্গোপসাগর কিংবা আইসল্যান্ডে আছড়ে পড়া আটলান্টিকের স্মৃতি। ডেনমার্ক বা জার্মানির বাল্টিক সাগরের তীরে এর থেকে বেশি ঢেউ দেখেছি। তবে, ভূমধ্যসাগরের নীলাভ থেকে ক্রমান্বয়ে গাঢ় নীল হয়ে যাওয়া রঙ হাঁপিয়ে-ওঠা মন শান্ত করে। ভাবা যায়? এই জলের অন্যপাড়ে আফ্রিকা মহাদেশ। জল পার হয়ে ওপারে গেলে মানুষের রঙ, ভাষা, সংস্কৃতি সবকিছুই আলাদা। সাগরের তীর ধরে দেখি দোকানিরা রকমারি জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেছে। জিনিসপত্রের দরদাম করার সুযোগ রয়েছে, তবে জার্মানি থেকে দাম তুলনামূলক কম। বার্সেলোনায় গিয়ে একই রকম দেখেছি।

লা’ স্কালা থেকে বার্সেলোনা কাছে হওয়ায় সমুদ্রতীরে ক্যাম্পিং-এর একদিনের পুরোটা বরাদ্দ ছিলো বার্সেলোনার জন্য। বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে শুনে বার্সেলোনাকে যেরকম তিলোত্তমা ভেবেছিলাম ঠিক ততটি যেন নয়। তবে তার পুরোনো ভবন আর ওল্ড টাউন বিস্মিত না করে পারে না। পরতে পরতে পুরান ঢাকার সরু অলিগলির কথা মনে হয়। দারুণ পরিচ্ছন্ন। শহরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে প্রচুর বইয়ের দোকান, জাদুঘর, আর মন্দির। তার কয়েকটাতে ঢু মারতে মারতে খুঁজে পাই বহু পুরোনো সাগ্রাদা ফামিলিয়া মন্দির। নির্মাণ ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ চলায় তাকে সেভাবে উপভোগ করার সুযোগ হয়নি। কাতালোনিয়া অঞ্চলে গেলে বার্সেলোনার সাগরতীর, জাদুঘর, মন্দির, বইয়ের দোকান আর বিশ্বখ্যাত ফুটবল স্টেডিয়াম ‘কাম্প ন্যু’ না ঘুরে আসা হবে বোকামি। কাম্প ন্যু আর বার্সেলোনা ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা বিচিত্র। সেগুলো বর্ণনা করতে গেলে আলাদা একটা লেখা তৈরি করাই শ্রেয়।
সমুদ্রতীরে ক্যাম্পের শেষ সাতটি দিন ছিলো অনেক রকমের। কোনোদিন সায়াহ্ন থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সাগরের তীরে বসে কাটিয়েছি, কোনোদিন ভোরের আগে উঠে একাকি সাগরপাড়ে গিয়ে সূর্যোদয় দেখেছি—তখন কখনো মনে হতো আমি আর সেই আমি নেই; বাংলা-দেশের সেই জীবন কর্পুরের মতো কথায় যেন উড়ে গেছে--অন্য কোনো দুনিয়া যেন আমার জীবন চিরে ঢুকে আছে। যত ভ্রমণ করি, যত বেশি রকমফের ঘটনার ক্রীড়া দেখি তত বেশি যেন দ্বিধায় পড়ি। তবু ধীরে ধীরে করোটির ভেতর নতুন ফুলের সুবাস বাড়তে থাকে।




