আমি ঠিক জানি না, কোন গল্পটা আপনাদের বলা উচিত। কোন গল্পটা শেষ পর্যন্ত গল্প হয়ে উঠবে, বিশ্বাসযোগ্য হবে। আমি সত্যিই উনাকে দেখেছি। আমার দেখার কথা ছিল না। সলিমুল্লাহ রোডে তো একেবারেই না।
তিনি যে বাক্য ও শব্দে কথা বলেন, তাতে টানটান একটা সুর থাকে। উচ্চারণ মারাত্মক স্পষ্ট। উনার সামনে আপনার কথা বলতে ইচ্ছে করবে না। ঠোঁটমুখ শুকিয়ে আসবে। আপনার মনে হবে, এই শহরটাতে জন্ম নেওয়া উচিত ছিল। গাড়ি-বাড়ি হবে। সবাই ধরেই নেবে, আপনার বংশে কেউ একজন ভূমিদস্যু বা মারাত্মক দুর্নীতিবাজ ছিল। একটা প্রতিবন্ধী সন্তান থাকবে। তাকে ঘিরে এসব ধারণা আরও পাকাপোক্ত হবে।
যাকে আমি এখন নিয়ে দুইবার দেখব, তার নাম আমি জানি না। দেখেন, আন্দাজ করতে পারেন কি না। তার ফেসবুক বা ইমু আইডি খুঁজে পান কি না।
উনার সঙ্গে ঐদিন ডেলিভারিম্যানের মারাত্মক তর্কাতর্কি হচ্ছিল। ক্রিমের মতো দেখতে টিউবগুলোতে উনি কী যেন খুঁজছিলেন। হয়তো মেয়াদ আছে কি না, কিংবা অরিজিনাল প্রোডাক্ট কি না, তা যাচাই করতে চাইছিলেন।
নামটা যেহেতু আমি বলতে চাইছি না, তাই উনার সম্পর্কে আপনাদের একটু বলি। উনার পরনে ছিল উজ্জ্বল জলপাই রঙের একটা লং জামা। পেট পর্যন্ত হিজাব। মাস্ক পরা, যদিও ধুলোবালি নেই। করোনা বছর পাঁচেক আগেই শেষ।
কপাল, প্লাক করা ভ্রু। কানগুলো চেহারার তুলনায় ছোট। আমি যেহেতু জীবনের একটা বড় সময় নারীকে যৌন আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকে দেখেছি, দেখিও, তাই উনার বুকের দিকে তাকিয়ে স্তনের আকার ও গড়ন বোঝার চেষ্টা করেছি। হিজাবের জন্য তেমন দেখা যাচ্ছিল না। মোটররিকশাগুলো দ্রুত চলে যাওয়ার বাতাসে মাঝেমধ্যে কিছুটা বোঝা যাচ্ছিল। ভালোই। আমাকে সন্তুষ্ট করেছে।
উনার উচ্চতা তেমন না। কোনোরকমে পাঁচ ফুট হবে। এর বেশি বললে হয়তো লেখাটা নিয়ে, আমাকে নিয়ে, আপনাদের মনে কিংবা প্রকাশিত প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে মারাত্মক ক্ষোভ তৈরি হবে। ব্লাসফেমি আইনের মতো কঠোর যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।
তারপর উনার সঙ্গে দেখা হয় টাউনহল বাজারে। হাতে বাজারের ব্যাগ। মুখে মাস্ক। কনুই পর্যন্ত জামা। একবার বগলের দিকে তাকালাম, ঘেমে ভিজে আছে কি না। না। কপালেও ঘাম নেই। যথেষ্ট মেকআপ দেওয়া বোঝা যাচ্ছে।
নুডলস-সুপের টং, চায়ের স্টল, নোটারি দোকান পার হয়ে গেলেন। অফিসে যাওয়ার যেহেতু তেমন তাড়া নেই, পিছু নিলাম।
উনি নিষ্প্রভ। উত্তেজনা নেই। রাস্তার ভিড়, হর্ন, অনিয়ম কিছুই উনাকে বিরক্ত করছে না। হেঁটেই যাচ্ছেন। মাথা, মন ও শরীরের সংযোগহীন, একপ্রকার অনুপস্থিতিতে ভোগা মানুষ আগেও দেখেছি।
থেমেছেন কসমেটিকসের দোকানে। এগোতে ইচ্ছে করছে না। দোকানদারের সঙ্গে বেশ খুনসুটির সম্পর্ক আছে মনে হচ্ছে। উনারও কি এমন বয়স? হতে পারে। পঁয়ত্রিশ? চল্লিশও হতে পারে।
প্রায় এক ঘণ্টা এটা-সেটা দেখে খুব ছোট একটা খাম নিয়ে বের হয়ে এলেন। সম্ভবত লিপস্টিকের আকারের কোনো কিছু। সত্যি বলতে, এসব কসমেটিকসের নাম আমি জানি না। স্নো, পাউডার, লিপস্টিক, কাজল, আইলাইনার পর্যন্তই আমার জ্ঞান। বাকি যা যা বলব এই গল্পে তা সবই ধারণা।
উনি এখন আমার দিকে এগিয়ে আসবেন। চোখাচোখির জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। তাকাননি একবারও। দৃষ্টি কোথায় ছিল, সেটাও আন্দাজ করতে পারিনি। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় গায়ের ঘ্রাণ পাওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। সেটাও হলো না। তবে বিদেশি পারফিউমের তীব্র গন্ধে আমি আহত বোধ করি। মাথা ভার হয়ে আসে।
উনার গলার ভাঁজ কিছুটা দেখেছি। বেশ ফরসা। যথেষ্ট মেকআপও।
মেকআপ নিয়ে উনার আগ্রহ অনেক। তারপর আর কোনোদিন দেখিনি। দেখার কথাও না। প্লাস্টিক সার্জারি এখন কমন বিষয়। ডায়েট কমন বিষয়। এগুলো নিউ নরমাল। মাস্কও করোনার পর কমন হয়েছে।
এই রোডে অনেক মানুষ ভিড়েছে। চাকমা, মারমা, গারো, ম্রো যেহেতু আলাদা করে বুঝতে পারি না, কারেক্টনেসের তোয়াক্কা না করেই বলি, সরি আগেই বলি, ‘পাহাড়ি’ বললেই হয়তো পরিচিতিমূলক হয়।
এদের সংখ্যা বেড়েছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলের বুয়াদের আধিপত্য বেড়েছে। কারণ, হাওরবাঁওড়ে কৃষি এখন লস প্রজেক্ট। পড়াশোনাও। মিডল ইস্ট ছেড়ে ‘লেবানন হয়ে ইতালি’ যাওয়াটা এখন নিউ নরমাল।
এত অ্যাক্টিভিস্টসুলভ কথা বলার কারণ আছে। পরের যে চরিত্রগুলো আসবে, তাদের বুঝতে হলে এগুলো আপনাকে জানতে হবে।
উনার চার ভরি স্বর্ণ যে বুয়াটা চুরি করেছে বলে আমাদের সবার সন্দেহ, তার বাড়ি নেত্রকোণায়। কালো, রোগা। বয়সের চেয়ে শরীর বেশি বৃদ্ধ।
উনার নিচতলায় ভাড়াটিয়া কাম কেয়ারটেকার থাকে। সে ম্রো সম্প্রদায়ের। দিনের বেলা সুপারশপের দারোয়ান, রাতে এই দশতলা বিল্ডিংয়ের। তার দুই ছেলে ও স্ত্রী এই বিল্ডিংয়ের ফুলটাইম কেয়ারটেকার। তার স্ত্রীর সঙ্গে আমার মনোদৈহিক সম্পর্কটা নিয়ে একটা চ্যাপ্টার অবশ্যই লিখব।
উনার জামাই, দ্বিতীয় মেয়েটা যার ঘরের, সে থাকে সৌদি আরবে। তাকে নিয়েও লিখব। অবশ্য তার সেক্সুয়াল লাইফ নিয়ে আমার আগ্রহ আছে। সেদিকে লেখাটা যেতে পারে।
এসব নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে। কোন গল্পগুলো আসলে হুক তৈরি করবে।
এখন থেকে আপনারা যা পড়বেন, সবটাই আমার বানোয়াট গল্প, কল্পনা বলা যায় (এইআই থেকে পরামর্শ নেব কিনা কয়েকটা অধ্যায়ের পর ক্লান্তি আসলে চেষ্টা করব)। কারণ এরপর থেকে আমি কোনো দিন উনাকে দেখিনি। দেখলেও হয়তো চিনিনি।
হয়তো আজ উনি সমস্ত কাজ বুয়াকে দিয়ে ক্রিমটিম নিয়ে বাথরুমে ঢুকেছেন। পায়ের লোম তুলবেন। মুখে মাটি ও অন্যান্য জিনিসের মিশ্রণ লাগবেন। বগলের কালচে দাগ তুলতে কোনো একটা ক্রিম হয়তো লাগাবেন। হাতের লোমগুলো ওয়াক্স করবেন। আপার লিপ করবেন। থুতনি ও চিবুকের লোমগুলোরও একটা ব্যবস্থা করবেন। চুলে অনেকক্ষণ ধরে শ্যাম্পু করবেন।
নিজের শরীর, নিজের স্পর্শের বিন্দুগুলো এক সারিতে টেনে হয়তো নিজেকে একটু তলিয়ে দেখবেন, হাবুডুবু খাবেন। কামনা করবেন ষাঁড়ের মতো হিংস্র কোনো জন্তুকে, বা কাউকেই না। অভ্যাসবশত কোনোভাবে হয়তো কিছু একটা হয়েই যাবে। অথবা কিছুই হবে না।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর উনি গোসল দিলেন। হয়তো এখন মনে পড়ছে, তার প্রবাসী স্বামী সন্দেহবশত একাধিক কল দিয়ে ফেলেছে। তার কোনো একটা সন্তান এই ফাঁকে প্রেমিককে মাস্টারবেশনে সাহায্য করছে। গোপন গোপন অনেক খেলার মধ্যে বুয়া হয়তো কয়েকটা জিনিস চুরির ফন্দি করছে। আরেকটা সন্তান হয়তো ভাড়া ঘরটাকে জাহান্নাম করে তুলছে।
উনি ভাবছেন থ্রিপিসটা নিয়ে। দুই সপ্তাহ আগে স্কুলের ফাংশনে যাবেন বলে কিনেছিলেন। টাকাটা বাজার থেকে বাঁচিয়েছেন। মাছ-মুরগির বদলে শাকভর্তা খেয়ে, অথবা ডায়েটের নাম করে টাকা জমিয়েছেন।
টাকাপয়সা নিয়ে উনার ভাবনা হয়তো দুই রকমের। বাজারের বাজেট কমিয়ে কাপড় কেনা। বাদবাকি ভাড়া, বিল, বেতনসংক্রান্ত টাকাগুলো ঠিকঠাক দিয়ে সৌদি আরবপ্রবাসী স্বামীর কাছ থেকে নানা অজুহাতে টাকা এনে গোপন অ্যাকাউন্টে জমানো।
এগুলো আমার ধারণা। বানোয়াট গল্প, আগেই বলেছি।
এই থ্রিপিসটা পুরোনো হতে আর দুই সপ্তাহ সময় লাগবে। তারপর আরেকটা কেনা লাগবে। তারপর আরেকটা।
হয়তো কথা ছিল, বিকেলে বের হয়ে পার্কে যাবেন। এখন ইচ্ছে করছে না। শরীর ফুরফুরে, মন বিচলিত। বের হলেই খরচ। ঘাম, ধুলোবালি, তীব্র গরমে মেকআপ গলে গলে পড়বে। মাস্ক পরে দম বন্ধ হয়ে আসে। মেছতার দাগগুলো জেগে ওঠে। দীর্ঘক্ষণ ধরে মেকআপ করতে হবে, একই সময় নিয়ে আবার তুলতে হবে।
নতুন একটা থ্রিপিস লাগবে। কেনাকাটা করতে মন চাইবে। খাওয়াদাওয়া করতে হবে। মেজাজ গরম হবে।
হয়তো উনি ফোন নিয়ে ভাবিদের বা বোনদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলবেন। হয়তো সাংসারিক কথা, হয়তো নিজের সংসার ও সন্তানের বাইরের কথা। হয়তো সৌদি আরবপ্রবাসী স্বামী কল দেবেন। কথা হবে, সাংসারিক কথা হবে।
মনে পড়বে, দুই বিয়ের মাঝামাঝি সময়ে আরেকটা পুরুষকে গ্রহণ করার সময়ের মারাত্মক একটা স্মৃতি। অথবা বর্তমান স্বামীই তার প্রতিপক্ষ।
হয়তো সে ঘুমাচ্ছে। গোসল থেকে বের হয়েই বডি লোশন দিয়েছেন। নাম না জানা কতগুলো প্রসাধনী একের পর এক তার চামড়ায় মিশে যাচ্ছে। সুঘ্রাণ ও উজ্জ্বলতা। আমি লিখতে লিখতে সেই ঘ্রাণ পাচ্ছি। কাম জেগে উঠেছে।
তার প্লেটে সিদ্ধ কিছু সবজি, শসা, ডিম। ভাত নেই।
হয়তো টিভিতে তখন ইউটিউব চলছে। ভয়ংকর সব সংবাদ গিলে খাচ্ছেন উনি। বদহজমের সম্ভাবনায় চ্যানেল পালটে নিচ্ছেন। বাংলা নাটক বা সিনেমার দৃশ্যের চেয়েও উজ্জ্বল, আরও তীব্র, আরও উন্মাদনা দিচ্ছেন ভারতীয় নায়িকারা। ঝকঝকে মেকআপ, দামি পোশাক, জিরো ফিগার।
নিজের প্রতি উনার রাগ বাড়ছেই। ওজন ছেচল্লিশে আনতেই হবে। ডায়েট নিয়ে হেলাফেলা করা যাবে না। ইউনিমার্ট থেকে অরিজিনাল বিউটি প্রোডাক্ট কিনতে হবে। সানস্ক্রিন আনাতে হবে…চলবে



