পানির ওপর ধারালো ছুরি চকচক করছিল। প্রথমে ভাবছিলাম, কেউ হয়তো খুন করে নদীতে ছুরি ধুতে এসেছে।

চুপ করে ছিলাম।

নড়াচড়া করলে না আবার ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দেয়!

চোখ বন্ধ করেও দেখতে পাচ্ছিলাম, খুনিশ্রমিকরা ছুরি-চাপাতি মন দিয়ে ধুচ্ছে। কিন্তু কতক্ষণ লাগে ধুতে!

চকচকে আলো চোখের ভেতরের অন্ধকারে কাঁপছিল। আমি সাহস করে চোখ খুলে দেখি, না, দশটা-এগারোটার সূর্য তার সবটা রোদ পানির ভেতর ঠেসে দিচ্ছে।

তীরে উঠে বসলাম।

আমি ৩৪ নম্বর চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরছিলাম। দুপুরেই ফিরতে পারতাম, কিন্তু হঠাৎ শহরটা আগুন, গুলি ও টিয়ারশেলে ধ্বংস হতে হতে রাত হয়ে গেল।

আমার পরনে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট। জুতা নেই, মোজা আছে এক পায়ে।

বুকের ভেতর হাত দিয়ে দেখলাম, কিছু নেই। মনে হয়, কেউ হৃৎপিণ্ড খুবলে নিয়ে গেছে।

আমি মোজাটা খুলে ভালো করে পানি নিংড়িয়ে বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে মুছে নিলাম।

একটা চোখ ঝুলে আছে। সেটাকে ছিঁড়ে নদীতে ফেলতেই সাকার মাছ এসে টুপ করে খেয়ে নিল। দেখে খুব ভালো লাগছিল।

আরেকটি চোখ মাছকে দিতে পারতাম। চোখ ছাড়া নিশ্চয়ই ভালোভাবে চলতে পারব।

আমি তীর ছেড়ে শরবনের দিকে যাচ্ছিলাম। নিচ থেকে কে যেন আমার প্যান্ট টেনে ধরল। চিৎকার করে কান্না শুরু করল, কিন্তু কাশির জ্বালায় বেচারি কাঁদতে পারল না।

আমি ওর কাছে বসে বললাম, ‘আমার কাছে কাশির ওষুধ নাই।’

ও এবার কাশির সঙ্গে কান্নাও জুড়ে দিল।

আমি প্যান্টের পকেট হাতড়ে খুঁজতে লাগলাম, লবঙ্গ-দারুচিনি কিছু আছে কি না। তাহলে চিবিয়ে ওর মুখে রস দিতে পারতাম। বেচারি আরও কাশলে বমি করে দেবে।

আমি ওকে কাঁধে নিয়ে পিঠে চাপড় দিয়ে দিয়ে দোলাচ্ছিলাম। ঘুমিয়ে পড়লে রেখে চলে যাব। কিন্তু ওর ঘুমানোর লক্ষণ নেই। মুখে বোল ফুটেছে, শুধু বলছিল, ‘বাসায় যাব, বাসায় যাব।’

আশপাশে কোনো বাসাবাড়ি দেখতে পাচ্ছি না। শরবন পেরিয়ে দীর্ঘ শূন্যতার নিচে বালুর চর।

আমি কিছু শুকনা ঘাস-লতাপাতা ছিঁড়ে একটা বালিশের মতো বানিয়ে ওকে শোয়ালাম। আমাকে বসতে দেখে ও আশ্বস্ত হলো।

ওর প্রস্রাব করার জায়গাটাতে ড্রেসিং করে দিচ্ছিলাম, কিন্তু ক্ষতস্থানটা মনে হচ্ছে একটু একটু বড় হচ্ছে। নাকি রক্ত-কাদামাটি মুছে দেওয়ায় এমনটা দেখাচ্ছে, কে জানে।

আমি শার্ট খুলে নদী থে‌কে ভালো করে কেচে এনে সেই ক্ষতের ভেতর কাপড়ের বল বানিয়ে ঠুসে দিলাম।

‘এক্ষুনি ভালো হয়ে যাবে।’

বুক ও ঘাড়ের কামড়গুলো নিয়ে আপাতত ভেবে কাজ নেই। ওগুলো খুব বেশি ক্ষত নয়।

আমি বললাম, ‘তুমি হাঁটতে পারবে?’

ও শোয়া থেকে উঠে দুই পা দুই দিকে ফাঁক করে আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করল।

আমি কাঁধে চাপড় দিয়ে বললাম, ‘গুড গার্ল।’

‘তুমি কি তোমার নাম বলবে? আমার নাম কবির।’
‘মাই নেম ইজ হুসাইনা।’
‘শুধু হুসাইনা? নাকি আরও কিছু আছে?’
‘সবাই আমাকে হুস বলে। তুমিও বলতে পারো।’
‘দুষ্টুমি করছ?’
‘না, আব্বু হুস হুস করে আমাকে ডাকে।’
‘ওকে… চলো, আশপাশে বাসাটাসা খুঁজি।’
‘ওরা মারবে না?’
‘না, না, মারবে কেন!’

আমাদের পথ ফুরাচ্ছিল না। কিছুটা পথ ওকে কোলে নিতে হলো। ওকে যতটা হালকা ভেবেছিলাম, ও ততটা হালকা নয়।

একটা কলাঝোপের নিচে এসে মনে হলো, এখানে একটু বসি। ছায়া ও ঠান্ডা হাওয়া দুই-ই আছে।
আমি ভালো করে খুঁজে দেখছিলাম, পাকা কলা পাওয়া যায় কি না।

‘আমি কিন্তু কলা খাব না।’
‘কেন? খিদে পায়নি?’
‘কলা খেলে ওয়াক আসে।’ ও বমি করার অভিনয় করল।
‘আরে না, এই কলা খুবই ভালো। বিষ দিয়ে পাকানো না।’
কলা না পেয়ে আমি দুটি কলাপাতা ছিঁড়ে বিছানা বানিয়ে বললাম, ‘এখানেই থাকি, কী বলো?’
‘আমি কিন্তু ঘুমাব না।’
‘কেন?’
‘ঘুমালে যদি তুমি চলে যাও!’
‘ধুর বোকা, তোমাকে ফেলে যাব কেন?’

হুস আমার বাহুর ওপর মাথা রেখে শুলো। চোখ আকাশের দিকে স্থির।

‘একটা গল্প বলো।’
‘ভূতের?’
‘না।’
‘খরগোশের?’
‘এক ছিল এক খরগোশ। একদিন ভাবল, সে তার বন্ধুর বাড়িতে যাবে।’
‘না, এই গল্প না। এই গল্পটা আমি জানি।’
‘না, তুমি জানো না।’
‘বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে দেখল, বন্ধু নাই। বন্ধুর বাবা তার বন্ধুদের সঙ্গে লুডু খেলছিল, তখন খরগোশকে ডেকে বলল…’
‘না, গল্পটা এমন নয়।’

আমার ঘুম আসছিল। হুস আগেই ঘুমিয়ে গেছে। আমি আমার বাহু থেকে ওর মাথাটা আস্তে করে নামিয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখার জন্য যাব ভাবছি।

সূর্য পশ্চিমে হেলতে শুরু করেছে। কলাঝোপের ভেতর কমলারোদ ভেঙেচুরে ঢুকছে।

আশপাশে কাউকে পেলাম না। অবশ্য খুব বেশি দূর যেতে পারলাম না। হুস যদি জেগে উঠে আমাকে না পায়, কান্না জুড়ে দিতে পারে।

আমি কিছু বুনো কুল, মধু থাকতে পারে এই আশায় কিছু ফুল, আর পাখিতে খাওয়া একটি কলার অর্ধেকটা পেলাম। তাই নিয়ে আমাদের কলাবাড়িতে এসে দেখি, হুস উঠে বসেছে। ঠোঁট ফোলা ফোলা, হয়তো কান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি হাত নেড়ে বললাম, ‘কেঁদো না, কেঁদো না, কাশি আসবে।’

খাবারগুলো কলাপাতায় ঢেলে বললাম, ‘এগুলো আমাদের রাতের খাবার।’

ওর ভাবান্তর নেই। আমি বুনো কুলগুলো মুখে দিয়ে দেখলাম, কষ কষ। কলা খেতেও রুচি হলো না। ফুলের ভেতর মধুর আশাও করলাম না।
আমি বললাম, ‘এসো, তোমার চুল বেঁধে দিই।’
ও পেছন ফিরে বসল।
আমি আঙুল দিয়ে চুল আঁচড়ে একটা খোঁপা বানানোর চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু বারবার খুলে যাচ্ছিল।
‘তুমি খোঁপা বাঁধতে পারো না?’
এই সামান্য কাজটি আমি জানি না ভেবে লজ্জা পেলাম।
‘কখনও বাঁধিনি, পারব কীভাবে?’
ও বাম হাতে চুল মুঠো করে ধরে, ডান হাত দিয়ে কীভাবে যেন পেঁচিয়ে একটা খোঁপা বানাল।
‘বাহ্, সুন্দর হয়েছে। তবে…’
‘তবে কী?’
‘তবে, খোঁপা যদি ঠিক মাথার ওপরে বানাও, তাহলে তোমাকে ঋষিদের মতো লাগবে।’
‘ঋ-তে ঋষি, ঋষি মশাই বসেন পূজায়।’
‘ঋ দিয়ে আরও তিনটি শব্দ বলো তো?’
ও কয়েকবার ঋ ঋ ঋ বলল, কোনো শব্দ খুঁজে পেল না।
‘ঋণ। ঋণ মানে কারও কাছ থেকে কিছু ধার করা।’
‘ধার মানে কী?’
‘এই ধরো, তোমার কাছ থেকে একটা কিছু নিলাম, তা কয়দিন পর আবার ফেরত দিয়ে দিলাম।’
‘তাহলে তোমার এই ফুলগুলো আমি ধার নিই?’
‘ধার নিতে হবে কেন? এমনিই নিয়ে নাও।’

ও আপনমনে কলাপাতা থেকে খুঁটে খুঁটে আঁশ বের করল। তারপর আমার হাতে এক প্রান্ত দিয়ে দড়ির মতো পাকাল। এরপর দুই প্রান্ত এক করে একটি গিঁট দিল।
‘এই দড়ি দিয়ে কী করবে?’
‘কিছুই করব না।’
সন্ধ্যা শেষে টুপ করে অন্ধকার হয়ে গেল।
আমি বললাম, ‘আমাকে এখন বিদায় বলো।’
‘মাছ ধরবে?’
‘না, মাছের সঙ্গে থাকব।’
‘বেশ মজা তো! আমিও যাব।’

আমি মনস্টারের কথা বলে ভয় দেখানোর চিন্তা করছিলাম, পরে ভাবলাম, ওকে সঙ্গে করেই নিই।
আমরা আবার হেঁটে হেঁটে নদীর তীরে গেলাম। ঠান্ডা বাতাস বইছে। দূরে দূরে নৌকার হারিকেন জ্বলছে।
আমি ওর হাত ধরে ধীরে ধীরে হাঁটু পর্যন্ত নামলাম। শুকনা প্যান্ট ভিজে গেল। দুই হাত নেড়ে নেড়ে বললাম, ‘সাঁতার জানো?’
‘মাছ কি সাঁতার জানে?’
‘মাছ সাঁতার জেনে কী করবে?’
‘আমিও জেনে কী করব?’
‘তুমি কি মাছ?’
‘মাছ না হলে কি মাছ হওয়া যায় না?’

ওর কথায় একটু রূঢ়তা টের পেলাম। মনে হলো, রেগে আছে। বললাম, ‘সবাই সবকিছু হতে পারে।’
ডুব দেওয়ার পর দেখলাম, পানির নিচে গোলাগুলি, আগুন, টিয়ারশেল।

মানুষ চিৎকার করে দিগ্‌বিদিক ছুটছে। কয়েকটা মাথা ফুটবলের মতো আমার দিয়ে ছিটকে এলো। আমি হেড দিতে না চাইলেও দিতে হলো, দুইএকটা ধরতে হলো।
পুলিশের জটলা বাড়ছে। হুইসেলে কান ফেটে যাবার দশা। আর্মির টহল দেখেও কেউ শান্ত হচ্ছে না।
শপিংমলগুলো লুট হচ্ছে। ইট ঠুকে ঠুকে কাঁচ ভাঙছে। কেউ কেউ পেট্রোল বোমা ছুড়ছে, টায়ারে আগুন দিচ্ছে।
ধোঁয়ায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। পকেটে ইনহেলার খুঁজছিলাম। আমার ভয় লাগছিল, মনে হচ্ছে, এই অরাজকতা থেকে বের হতে পারব না। এসময় কেন যেন ইন্টারভিউর কথা মনে হচ্ছিল। আমার ঠিকানায় যদি নিয়োগপত্র আসে, আমি যদি ঠিক সময়ে জয়েন করতে না পারি, ওরা কি আমাকে চাকরি দেবে?
এই চাকরিটা আমার পেতেই হবে।

একটা বড়সড় জনতার ঢেউ আছড়ে পড়ল আমাদের ওপর। আমি একটা ভাঙা নৌকার গলুইয়ের পেছনে লুকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, এই স্রোত শেষ হবে না। হঠাৎ খেয়াল হলো, হুস আমার কাছে নেই। আমার মুঠো থেকে ও বেরিয়ে গেল, নাকি আমি ওর কথা ভুলে মুঠি আলগা করে দিলাম, বুঝতে পারলাম না।

আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি শ্বাস নিতে পারছি না। একবার স্থির হয়ে বসে লম্বা একটা শ্বাস নেওয়ার অভিনয় করলাম, মস্তিষ্ক তাতে সাড়া দিচ্ছে না।

আমি ঝটপট তীরে উঠে বসে কয়েকবার লম্বা করে শ্বাস নিলাম। বাতাসে পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন দেখতে না পেলেও আশেপাশে টায়ার পুড়ছে বুঝতে পারছি।

আমি এখন বিশ্রাম নেব। চোখ আর খুললাম না। প্যান্টের সঙ্গে প্লাস্টিকের পা-দুটি খুলে শুয়ে পড়লাম বালিতে। পা থাকলে আবার হাঁটতে ইচ্ছে করবে।