মফস্বল শহরের বুকের ভেতরের ছোট্ট আদুরে স্টেশনের প্লাটফর্ম থেকে নেমে কিছুটা পশ্চিমে রেললাইন ধরে এগিয়েই ছোট ছোট ঘুপচি ঘরগুলোর কোনো একটাতে ঢুকে পড়েছিলাম আমি; আমার প্রথম প্রেমিকা যখন আমাকে না জানিয়েই অন্য একজন পুরুষের দেয়া আঙটি হাতে পরে ঢ্যাং ঢ্যাং নাটক এঁটে আমার সামনে এলো, তখনই প্রেমিকার ওপর চরম ক্রোধ থেকে আমি এক ঘুপচি ঘরের এক মধ্যবয়সী নারীর কাছে গিয়ে মাত্র ২০ টাকার বিনিময়ে নিজেকে শান্ত করতে চেয়েছিলাম। প্রথম সঙ্গমের মধ্যবয়সী সেই নারীর মুখটা আমি কোনোদিনই আর মনে করতে পারি না। ঘুপচি ঘরের টিমটিমে আলোয় তার মুখটার দিকে আদতেও আমি তাকিয়েছিলাম কিনা একদম মনে নেই। ঘরটার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধলোক আমাকে ইশারায় ডেকেছিল। ছোট একটা তক্তপোশের ওপর আমি গিয়ে বসলাম। ঘরের ভেতরের আরও একটা ছোট্ট ঘুলঘুলি পাকানো কক্ষের পর্দা সরিয়ে মধ্যবয়সী সেই নারী এসে নিজে নিজেই সালোয়ার খুলে আমার সামনে ব্যাঙের মতো দুটো ঠ্যাং কেলিয়ে শুয়ে পড়ল। ময়লা আলোতে তার শরীরের রঙ সম্পর্কে আমার কোনো স্মৃতি তৈরি হয়নি। তার ঘর থেকে বেরুনোর পর রেললাইন ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে গিয়ে জগতি রেলস্টেশনের ভৌতিক প্লাটফর্মে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। দিনের বেলা দুটো তিনটে রেলগাড়ি এই স্টেশনে থামে। সন্ধ্যার পর থেকে আর কোনো রেলগাড়ি এই লাইনে চলে না। স্টেশনের কপালের এক কোনে একটা টিমটিমে আলো, আলোর নিচে অনেকগুলো নতুন পাখা গজানো পিঁপড়েরা নিজেদের মৃত্যু নিয়ে খেলছে। পরিত্যক্ত স্টেশন মাস্টারের কক্ষ থেকে কয়েকটি চামবাদুড় বাইরে বেরুচ্ছে আর কিচিকিচি করতে করতে ভেতরে ঢুকছে। আমার প্রতারক প্রেমিকার শরীরের প্রতি গড়ে ওঠা আমার লোভ আমাকে বিধ্বস্ত করে যাচ্ছিল। আমি ওর নরম হাত ধরেছি। বারদুয়েক কষে ওর পাতলা ঠোঁটের লবণ আমি নিয়েছিলাম। সত্যিই ভালোবাসা দিয়ে ওর জাদু দেখার জন্যে আমি অপেক্ষা করতাম। মশুরের ডালের মতো ওর শরীরের রঙ আমি চোখের ভেতরে আঁকতে গিয়ে হেরে গেলাম। অসংখ্য খাঁজকাটা কালো পর্দা বাতাসে খেলে খেলে আমার চোখটাকে ক্লান্ত করে দিচ্ছিল। আমার চোখের সামনে বাণী সিনেমা হলের বিরাট পর্দার মতো একটা আবছা আলোর পর্দা এসে দাঁড়ায়। চারপাশ জড়ানো নিকষ অন্ধকারকে ওভারল্যাপ করে আরও কালো দুটি উদোম মূর্তি-পুরুষ তার বাহুতে বল দিয়ে নারীর মোমমূর্তিকে দৃঢ় ধরে, নারীও হেলেসাপের মতো মায়াবী পেঁচিয়ে পুরুষকে পুলকে রেখেছে। তাদের দ্যোতনা ছড়িয়ে পড়ছিল সারা ঘরে। এরকম দৃশ্য আমি প্রথম দেখেছিলাম খুব ছোট বেলায়-বাবা-মায়ের সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমানোর বয়স তখন। সেই হর-পার্বতীর মূর্তি আমার ভেতরের চোখগুলোকে বিবশ করে রেখেছিল। প্রথম সঙ্গমের পরে আমার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মিথুন ভাস্কর্য আমাকে কষে একটা থাপ্পড় দিয়েছিল। সঙ্গম নিয়ে কৈশোর পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা কুহকে যেন ঘ্যাচাং করে ছুরি বসিয়ে দিল। আমি মনে মনে ততটাই বেপরোয়া হয়ে উঠলাম, কিন্তু দৃশ্যত কিছুই করতে পারিনি কোনোদিন। যথেষ্ট ভিতু, অনেকটা সুযোগের অভাবও। দ্বিতীয়বার ফাল্গুনের এক খাঁ-খাঁ দুপুরে মুনমুন ওদের জনশূন্য বাড়ির একটা কক্ষে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিলে আমি গিয়ে পড়লাম ওর বান্ধবী মাহমুদার পেটা শরীরের ওপর। আমি ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ওর কপাল থেকে নিজের জিহ্বাকে হিল্লিদিল্লি করে আনতে আনতে বুকে এসে যখন আরও ক্ষিপ্র হয়ে উঠেছিলাম, একটা তুমুল ধাক্কায় মাহমুদা আমাকে সরিয়ে দিয়েছিল। মাহমুদা আরও সময় নিয়ে, আরও লাজুক হয়ে, আরও গলে গলে লবণের যে ভাস্কর্য গড়তে চেয়েছিল-আমি তা সত্যিকার অর্থেই ম্যাসাকার করে দিয়েছিলাম। নির্বোধ ও লোভীর মতো। মাহমুদার নামটা মনে আছে, মুখটা মুছে গেছে।

তারও বেশ কিছুকাল পরে ছোট্ট শহরটা ছেড়ে বড় শহরে এসেছিলাম উচ্চ শিক্ষার জন্যে; বন্ধু হয়ে ওঠা সহপাঠীদের অনেকেরই তখন এপট্টি ওপট্টিতে গতায়াত। সেইসব গল্প আমার সামনে হিহি করে হেসে উঠলে হোস্টেলের কমন টয়লেটের সাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে একটা মায়াবী কালোর ভেতরে নাচতে থাকা মিথুন ভাস্কর্য আমাকে বিহ্বল করে তোলে। আমার টাকা ছিল না, সাহসও। একদিন বড় শহরের বড় ও যানজটের সড়ক ধরে বিমনা হাঁটছিলাম। একটা দ্রুতগামী বাস ধুলোমিশ্রিত বাতাস ছড়িয়ে সাঁই ছুটে গেল। ধুলোবাতাসের আস্তিন সরে গেলে, দেখি-দু-তিনটে একশ, একটা পঞ্চাশ, আরও কিছু খুচরো দুচার টাকা রাস্তায় পড়ে স্বাধীন উড়ছে। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরেও টাকাগুলো কেউ তুলছে না। আমি তুললাম। হাঁক ছাড়লাম। পথচারী কেউ টাকাগুলোর স্বত্ব নিয়ে এগিয়ে এলো না আমার কাছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর টাকাগুলোর মালিক হয়ে গেলাম আমি। একটা রিকশা করে আধাঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম মগবাজারের একটা হোটেল পাড়ায়। সারাদিন ঈদে মিলাদুন্নবি বলে সমস্ত হোটেলের দরজা বন্ধ করে দিয়ে দালালগুলো তাস খেলছিল-বলছিল সন্ধ্যায় আসেন। বেশ্যাপাড়াকে এভাবে ধার্মিক হয়ে যেতে দেখে আমার ভীষণ মেজাজ চড়ে গেল। হোটেলগুলোর পেছনের বিরাট লেকটার ধারে গিয়ে মরা দুবলো ঘাসের ওপর ঘুমিয়ে পড়লাম। বিকালে ঘুম চোখ থেকে সরে গেল। কিছু বাদাম কিনে চিবুতে চিবুতে সন্ধ্যার জন্যে জিগির করছিলাম। কুড়িয়ে পাওয়া টাকাগুলো সন্ধ্যায় যেই মেয়েটির পেছনে আমি খরচ করলাম, হোটেল থেকে বেরিয়েই তার চেহারা আর কোনোদিন মনে করতে পারিনি। হোটেলের স্যাঁতসেঁতে কামরার বীর্যপচা গন্ধ মনে আছে, আমাকে ব্ল্যাক মেইল করে বেশি টাকা বাগিয়ে নেয়া দালালের কালো গোপের জেল্লা মনে আছে।

আশ্চর্য অন্ধকারে ফুটে থাকা সঙ্গমদৃশ্যের সেই মূর্তিকে আমি খুঁজতে খুঁজতে শেষবার গিয়েছিলাম দোলপুরের বিশাল পল্লিতে-নানা বয়সের শত শত নারীদের দাঁড়িয়ে থাকা চোখের ভেতর থেকে, ওদের ঠোঁটে আলকাতরার মতো লেগে থাকা রঙিন লিপিস্টিক থেকে ছিটকে আসা অসহায়ত্ব আমাকে বিমর্ষ করে দিল। আমি নাজ নামের এক মেয়ের ঘরে ঢুকে প্রায় দুঘণ্টা বসে ছিলাম। মেয়েটি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে যখন প্রায় খিস্তি করার জন্যে রেগে উঠছিল, আমি তার প্রত্যাশিত সম্মানী দিয়ে যখন প্যান্টের চেইন খুললাম, বলল-এত ফুটফুটে ছেলে, তোমার বউ নেই, বান্ধবী নেই; এখানে আসছ ক্যান? আমি ওর কোমল ও করুণ শরীর থেকে টাকা উসুল করে বেরিয়ে এসে বিশাল পদ্মার পাড়ে বসে দেখেছিলাম, নদীর ওপারের দিগন্তরেখা নেমে আসা রাত্রির গহ্বরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে; বিশাল নদীটা একা হয়ে যাচ্ছে। নদীর প্রতিটা ঢেউ একা হয়ে যাচ্ছে। ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে অবারিত অন্ধকার একা হয়ে যাচ্ছে। হু হু চরের বাতাস একা হয়ে যাচ্ছে। হট্টিটি পাখিদের ডাকগুলো একা হয়ে যাচ্ছে। আমি প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় সঙ্গমের কোনো নারীর মুখ দেখতে পাচ্ছি না, আমার সঞ্চিত স্মৃতিবাক্সটা একা হয়ে গেছে। কেবল আবছা ছাইকালো অন্ধকারে পেণ্ডুলামের মতো দুলছে সেই মিথুন ভাস্কর্য। একা হয়ে যাওয়া স্মৃতি বাক্সটা কাঁধে করে বহুদিন বহুদিন হাঁটতে হাঁটতে আমি একটা নির্জন গ্রামের মধ্যে ঢুকে যাই। পত্র-পল্লবে ছাওয়া গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট ময়ূরাক্ষি নদীর জলে গা ধুতে ভালো লাগত আমার। অকারণ দুলে ওঠা ধানের মাঠের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগত। একদিন প্রাচীন এক অশ্বত্থতলায় বসে পাখিদের কুড়িয়ে আনা ফলমূলের অবশিষ্টাংশ খাচ্ছিলাম। মাটির পথ রাঙিয়ে এক তরুণী শহরের কলেজের দিকে যাচ্ছিল কাঁখে একবোঝা বই জড়িয়ে ধরে। আমি তার পিছু নিলাম। পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে আবার একটা বড় শহরে চলে এলাম। এখানে আর হাঁটা নয়। দৌড়ানো। একদিন শহরের জনবহুল পার্কটার মরা-উলুবনে বসে তরুণী আমাকে শেষমেষ বিয়ে করতে চাইল। আর বলল-আরও বেশি... দৌড়াতে হবে।

বিয়ের পরে শত শত বার ঘরে আলো বন্ধ করে দিয়ে মহিমাকে আমি কোলে তুলে নিয়েছি। মহিমাও আমাকে লতায় পাতায় পেঁচিয়ে রাখত। কিন্তু মাঝেই মাঝেই মনে করিয়ে দিত-দৌড়াও; এত বড় শহরে আরামে থাকতে হলে অনেক দৌড়াতে হয়, ইয়ার।

আমি দৌড়াতে থাকি। আর আমার চোখের সামনে দুলে ওঠে আধো-আলো-অন্ধকার ঘর। আমি আমার বাবা-মায়ের পাশে শুয়েছিলাম। কখন যেন ঘুম ভেঙে গিয়েছিল-অন্ধকারের মায়ার ভেতরে দুটো আদিম ভাস্কর্য নেচে বেড়াচ্ছে...