খেলায় হেরে যাওয়া মন খারাপ করা লাটাই থেকে ঘুড়িটা সুতোর সম্পর্ক বিচ্যূত হয়ে বেভুল ভেসে যাচ্ছে বাতাসে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুড়িটার অবিশ্যম্ভাবী পতন প্রায় নিশ্চিত জেনে বালকেরা মাঠের আলের পরে আল টপকাচ্ছে—কিন্তু বাতাস বড় সেয়ানা তখন, ঐ ভোকাট্টা ঘুড়িটা কখনো কখনো আকাশের গহিন মেঘের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে, আবার নামিয়ে আনছে নিচে; এ যেন বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের মতো মুখ থুবড়ে পড়বে মাঠের সবুজে। বাড়াদির মাঠের অনেক খানিক আল অতিক্রান্ত বালকদের কচি পা-গুলো মাঠের সীমানার প্রান্তে বিলের ধারে প্রতিষ্ঠিত হলে সূর্য তখন ক্লান্ত, ঘরে ফিরতে হবে তাকে; কিন্তু ভোকাট্টা ঘুড়িটাকে নিয়ে বাতাস তখনো খেলছে। বালকস্বভাবে পরাজয় নেই, ক্লান্তিও বিধেয় নয়— ফলে জোঁক-সাপ আর বিলের হাঁটুজলে জেগে থাকা আউশধানের পাতার সুতীক্ষ্ণ ধার অগ্রাহ্য করেই সবাই বিলের জলে নেমে ঘুড়িটার পেছনে দৌড়াতে থাকলে সমুও পঙক্তি রক্ষা ক’রে জলে নেমে পড়ে। বাতাস হেয়ালি খেলায় ক্ষান্ত দিলে ঘুড়িটা উড়তে না-জানা পক্ষীশাবকের মতো বিপন্ন হয়ে বিলের মাঝে সামান্য দ্বীপসদৃশ ঢিবিমতো উচুস্থানে প্রকাণ্ড বটগাছের চূড়ার একটি ডালে পতিত হয়; তখন বালকেরা হৈ-হৈ করতে করতে, যেনবা বর্গিদের দুর্গ দখল করেছে— উল্লাসে তারা উপস্থিত হয় বিলের উঁচু স্থানে এবং অধিকতর ডানপিঠে দু’চার জন বালক প্রকাণ্ড বটগাছের চূড়ায় উঠে ঘুড়িটাকে জয় করার জন্যে ব্যস্ত হলে, অন্যান্য বালকেরা দুর্গ দখলের আনন্দ নিতে থাকে। দুর্গে রক্ষিত কে কোন সম্পদের অধিকার নেবে তার নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে; তখনও সমু সুবোধ, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সকলের প্রত্যুৎপন্নমতি ক্রিয়া অবলোকনে স্থির আর আসন্ন সন্ধ্যার আয়োজনের ভেতর বিলের মাঝে ভেসে থাকা এই দ্বীপের মায়ায় মগ্ন হয়। বন্ধুরা ওদিকে কেউ কেউ হয়তো অধিকার করেছে বেলেহাঁস বা মাছরাঙার নীলাভ ডিম, আবিষ্কার করেছে টুনটুনির ছোট্ট বাসা, আর বটের চূড়া থেকে ঘুড়িটাকে অধিকারে নিয়ে বিজিতের উল্লাসে নামছে বালকেরা, তখন সমু দেখে তার পায়ের নিচে কায়য়ুম পাখির অসংখ্য পালক বিন্যস্ত হয়ে আছে; বিদায়ী সূর্যের রেখে যাওয়া শেষ ক্ষীণ আলোয় সেইসব পালকেরা প্রদীপ্ত। সমু আপন মনে সেই সমস্ত পালক কুড়িয়ে নিতে থাকে, আর ততক্ষণে দূর্গ বিজিতরা নিজেদের রাজ্যে ফিরে যাবে ব’লে বিলের জলে নেমে যাত্রা শুরু করে। সমুর বিভোর পালক কুড়ানো শেষ হয় না কিছুতেই, হঠাৎ সম্বিত ফিরলে দেখে বন্ধুরা অনেকটা দূরে বিলের ভেতর সন্ধ্যার আবছায়াতে পর্যবসিত, তাদের কোলাহলও স্তিমিত। তার গা ছম-ছম করে ওঠে— সুনসান, অন্ধকারাবিষ্ট বিলের ভেতরে প্রকাণ্ড বটগাছের নিচে সমু একা— যে বটগাছ ঘিরে কিংবদন্তী ভৌতিক গল্প তার জানা ঠাকুরদা-জেঠাদের মুখে;— বাড়াদির এই বিলের বটগাছে এক পা আর ছাইরেড়িয়ার বিলের ওপারের বটগাছে আরেক পা, এমন বিশাল দৈত্যের গল্প তার আশৈশব শোনা। ভয় তাকে গ্রাসে নিতে চাইলে কায়য়ুম পাখির পালকগুলো দু’হাতের মুঠোতে সযতনে ধরে বিলের হাঁটুজলে নেমে জোরসে বন্ধুদের পংক্তিতে সামিল হতে সচেষ্ট হলেও সন্ধ্যার আধার আরও জেঁকে এসে রাত্রিকে প্রতিষ্ঠিত করলে এবার বাবার দৌর্দণ্ড বেতের ভয় বিপন্ন করে তাকে;— লাঠিখেলার মাঠে দুরন্ত আর যাত্রার মঞ্চের সম্রাটের বিক্রমে উজ্জ্বল বাবা— শতীশচন্দ্র সাহা, এতোক্ষণে নিশ্চয় বাড়ির দরজায় বেতটাকে বিক্রমী তলোয়ারের মতো হাতে ধরে নতুন সিংহাসনজয়ী সম্রাটের মহিমায় দাঁড়িয়ে আছেন। বিল মাঠ অতিক্রম করে খেলার সাথীরা যার যার গৃহের দিকে ব্যাপিত হলে নিশ্চিত প্রহারাশঙ্কা নিয়ে প্রায় চারশো বছরের পুরনো পরিত্যক্ত বাড়াদির মঠের পাশ দিয়ে সাহাবাড়ির বিশাল আমের বাগান পাড়ি দিয়ে সন্তর্পণে খানখা ঘরের দরজায় উপবিষ্ট হলে প্রতীয়মান রুদ্র ভাস্কর্যের প্রতাপ এসে সমুর নরম শরীরে লাগে। বেতের প্রহারে জর্জরিত হলেও দু’হাতের মুঠোতে কায়য়ুম পাখির পালকগুলো আগলেই রেখেছিলো সে। ভেতর বাড়ির বিরাট উঠোন পেরিয়ে ঠাকুমা দৌড়ে এসে উন্মত্ত শার্দুলের হাত থেকে কোমল মৃগশাবকে উদ্ধার ক’রে কুয়োপাড়ে নিয়ে গিয়ে সুশীতল জলে বিল-মাঠের কাদায় পর্যবসিত হাত-পা ধুইয়ে ঘরে নিয়ে বাতির আলোতে গেলে মা বিভামতী সন্তানের গায়ের জামা পরিবর্তন করতে গিয়ে দেখে— বেতের আঘাতে ছেলের পিঠ বাঘের ডোরার মতো অলঙ্কৃত হয়েছে আর মাখনে প্রলেপিত কোমল হাত-পা বিলের আউশধানের ধারালো পাতায় ক্ষত-বিক্ষত। গরম সরিষার তেলে মা বিভাবতী যখন শরীর মালিশ করে দিচ্ছে, তখনও বিলের ঢিবি থেকে কুড়িয়ে আনা কায়য়ুম পাখির পালকগুলো হাতে ধরে আছে সমু, কালো আর নীলে মেশানো কী অপূর্ব সেইসব পালক— মায়ের সোহাগ, শুশ্রূষা আর হাতে ধরা পালকের ওমে ঘুম কখন যে এসে আরও আরও পালকের দেশে নিয়ে গেছে তাকে— ঘুমের দেশে অযুত-কোটি পালকের ভেতরে ডুবে গিয়ে সে অনন্ত মহাশূন্যে ভোকাট্টা ঘুড়ির মতোই ভাসতে থাকে। সকালে অজস্র কায়য়ুম পাখির ডাকে তার ঘুম ভেঙে যায়— ঘুমিয়ে পড়ার সময়ও হাতে ধরে রাখা পালকগুলো সব যেন পাখি হয়ে আহ্লাদ করছে তার সিথানে। পাখিগুলো ধরতে গেলে জানালার শিক গলিয়ে আসা নবারুণের সোনালি গন্ধ ডানায় মেখে নিয়ে তাদের ফজলি বাগানের উপর দিয়ে এক-এক করে শত-সহস্র কায়য়ুম পাখি উড়তে উড়তে বাড়াদির বিলের প্রকাণ্ড বটগাছের দিকে যেতে থাকলে সমু তার বিস্ময়বিমুগ্ধ দৃষ্টি যেন চিরকালের জন্য নিবদ্ধ ক’রে রাখে পাখিগুলোর ঝাপটানো ডানার রঙে— আজ এই ষাট ছুঁই-ছুঁই বয়সেও সমু, এখন এই পরিণত সমরজিৎ সাহার চোখের স্মৃতি থেকে কায়য়ুম পাখির ডানার রঙ একটুও মুছে যায়নি। সময় পেলেই তার নির্মানাধীন সপ্ততল বিশিষ্ঠ দালানের চূড়ায় উঠে বাড়াদির বিলের দিকে বালকের চোখেই তাকিয়ে থাকে সমরজিৎ সাহা, কায়য়ুম পাখির পালকের রঙ আজও তাকে বিভোর করে রাখলেও সমকালীন সমূহ বিষাদ তাকে বিষণ্ন করে; শহরের তেড়ে আসা দালান-কোঠা আর অগণিত বিষাক্ত মাশরুমের মতো গজিয়ে ওঠা কলকারখানার দাঁতাল গ্রাসে বাড়াদির মাঠের বটগাছটা আজ আর নেই; বটগাছটা কবে যেন পাখি হয়ে কোনো এক অচিন হিমদেশে চলে গেছে। নির্মানাধীন এই দালানের চূড়ায় দাঁড়ালে এক ঝলকে শৈশবটা বাহারি সেলুলয়েড হয়ে প্রতিপন্ন হয় তার সমস্ত ইন্দ্রিয়ে, দশকে দশকে বদলে যাওয়া বাড়াদি গ্রামের পঞ্চাশ বছর আগের মানচিত্র জ্বল জ্বল করে— ঐতো তাদের সাহাবাড়ির চৌদ্দবিঘা জমির দিঘি, মালিকানা বদলে বদলে হেজে-মজে ক্ষীণপ্রাণ হলেও এখনও তার জলে পূর্ণিমার চাঁদ লাজনত ঘোমটা নামিয়ে স্নানে আসে; সাহাদের ফজলি বাগান, জলপাই বন, মন্দির নেই; নেই বাড়াদির বজরার ঘাট, গড়াইয়ের ঔরস থেকে বেরিয়ে আসা চিকন মরাগড়াইয়ে সিথানে বাড়াদির হাট, হাটের শনপাপড়ির, গুড়ের জিলাপি নেই; চার-পাঁচশো বছর আগের পুরনো বাড়াদির চূড়াভগ্ন মঠটা— ঐ তো, মঠের দেয়ালের বিচিত্র টেরাকোটার প্রায়শই তো লুপ্ত হয়েছে; তবু শৈশবে মঠের যেসব টেরাকোটার নকশা তাকে খুব টানতো, তা আজও তাকে বিভোর করে। তার মাথায় কিছু পরিকল্পনা কাজ করে— বাড়াদির পুরানো মঠের টেরাকোঠা থেকে কিছু সাজেশান নিয়ে নির্মানাধীন ভবনের ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কোনো নকশায় কাজে লাগানো যায় কি-না; ইন্টেরিয়র ডিজাইনার সাবিদ শাহরিয়ারকে নিয়ে নির্মানাধীন সপ্ততল দালানের চূড়ায় বসে পরিকল্পনা করে— সাবিদ আপনি তো তৃতীয় তলার রেস্টুরেন্টে আমাদের লোকাল নানা স্থাপনা আর হেরিটেজ থেকে কনসেপ্ট নিয়ে কিছু ডিজাইন ডেভেলপ করছেন; কুঠিবাড়ি, স্বস্তিপুর মসজিদ থেকে ফর্ম নিচ্ছেন, সাথে বাড়াদির মঠ থেকে কিছু ফর্ম আপনি যোগ করতে পারেন কি-না?
—নিশ্চয় দাদা। চলুন একদিন মঠটা দেখে আসি।
এক শুক্রবারের সকালে সমরজিৎ সাহার ক্রোড়াধিক মূল্যের অপরাজিতা রঙের গাড়ির পেটের ভেতরে ইন্টেরিয়র ডিজাইনার সাবিদ শাহরিয়ারকে নিয়ে সূর্যের নাঙা আলো লুটিয়ে পড়ে খেলাধুলা করা বাড়াদি গ্রামের সড়কে প্রবেশ করলে সমরজিৎ সাহা তার সমু নামের ভেতরের স্মৃতিকাতরতায় গলিত হয়; সমু নামে যারা তাকে ডাকতো বাড়াদির এই গ্রামে তারা আর কেউ নেই এখন, হারিয়ে যাওয়া সেইসব শৈশবসাথী কিংবা পাড়ার কাকা-জ্যাঠাদের মুখ তার মনে পড়ে, তাদের অবলুপ্ত ভিটেবাড়ির মানচিত্র সমুর এখনও নখদর্পনে— দেখেন সাবিদ, বামের এই দোতলা বাড়িটা হরগোপাল স্যারদের ভিটে, আমার পিঠের চামড়া এখনও তার বেতের স্মৃতিতে কাতর; গণিতের জাদুকর;—ঐ-তো যেখানে মসজিদটা দেখছেন, ওখানেই বাসন্তীপুজোর মেলা হতো; এইতো আমাদের বড় পুকুর—একবার বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে পুকুরের মাঝখানে ডুব দিয়ে কাদা তুলে আনার প্রতিযোগিতায় দিয়েছি ডুব, যাচ্ছি আর যাচ্ছি, সে কি অতল সাবিদ, গভীর— তল খুঁজে পাই না পাই, মনে হচ্ছিলো আমি যেন পৃথিবী ফুঁড়ে অন্য কোনো গ্রহে চলে যাচ্ছি, তারপর আকস্মিক হাতে কি যেন নরম বাধলো, মখমলের মতো, প্রকাণ্ড কিছু যেন নিশ্চুপ শুয়ে আছে পুকুরের অতলে; আর কীসের কাদা তোলা, ভুস করে যখন জল থেকে উঠলাম তখন যদিও আমি হেরে যাওয়া প্রতিযোগী কিন্তু হাফ ছেড়ে মনে হয়েছিল নতুন আর একটি জীবন পেলাম।
—ঐ তো অনিতাদের বাড়ি, অনিতা এখন বারাসাতে; শুনেছি দেশ ছেড়ে শেষবার যাওয়ার সময় ওদের জলপাইগাছের গোড়া থেকে ক’মুঠো মাটি নিয়ে গিয়েছিলো মায়ের পুরানো কাপড়ের টুকরোয় জড়িয়ে, ওদের বারাসাতের ফ্লাটের শো-কেসে কাচের বয়ামে এখানো রেখেছে মমতায় বেঁধে; অনিতাকে আমি একটা কায়য়ুম পাখির পালক দিয়েছিলাম ওর বাংলা বইয়ের ভেতরে দূর্গাপূজার ছুটি হওয়ার দিন, সেদিনই তো ওর শেষ স্কুল, পালকটিও কি অনিতা রেখেছে সযতনে এখনও, জলপাইগাছের তলার ঐ মাটির মতো কাচের বয়ামে না হলেও মনের কোনো নিরলাকোণে—স্মৃতি সাবিদ, স্মৃতি বড় ঘাতক। বাড়াদির রাস্তায় সমরজিৎ সাহার গাড়ির চাকা মাঝে মাঝেই অদ্ভুত কোনো আঠায় লটকে যাচ্ছে, শ্লথ হয়ে যাচ্ছে গতি আর এক-একটা স্মৃতির পসরা মেলে ধরছে সে। সমরজিৎ সাহার স্মৃতির উন্মোচিত এক-একটা বাক্স গাড়ির জানালা গলিয়ে গভীর মগ্নতায় দেখে চলেছে সাবিদ। বেশ কিছুক্ষণ পরে সাবিদ আবিষ্কার করে— বাইরে শরতের রৌদ্রমুখর দিন, কিন্তু গাড়ির জানালা কেমন কুয়াশাআবৃত হচ্ছে ক্রমশ। একটা জায়গায় এসে গাড়িটা অনেকক্ষণ স্থির হয়ে থাকলো, সমরজিৎ সাহাও নিশ্চুপ। তার দীর্ঘশ্বাসের ঘন বাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে গাড়ির ভেতরে আর ক্রমশ কুয়াশামলিন হচ্ছে গাড়ির জানালার গ্লাস। ধিরে ধিরে অতোটাই অস্বচ্ছ হলো গ্লাস, যে গাড়ির বাইরে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যেনো একটা মহাশূন্যের ভেতরে গাড়িটা সাবানের ফেনার মতো হালকা হয়ে ভেসে যাচ্ছে কোথাও। কুয়াশার ঘনত্ব গাড়ির ভেতরেও, এতোটাই নিরেট হতে থাকে ঘনত্ব, স্টেয়ারিঙে শব্দহীন বসে থাকা সমরজিৎ সাহাকেও গোচরে আনা অসম্ভব হয়ে পরে। এবার সাবিদের ভয় করে, গাড়ির ভেতরের এই গুমোট কুয়াশায়। সজোরে ধাক্কা দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে ফেলে— বাইরে দিব্যি রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন। সাবিদ ইতিউতি তাকায় চারিপাশে, দেখতে পায়— রাস্তা থেকে অপেক্ষাকৃত একটু উঁচু জঙ্গলাকৃর্ণ একটা জায়গায় পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে সমরজিৎ সাহা। এগিয়ে যায় সাবিদ। এসেছেন সাবিদ— বলেই ঘুরে দাঁড়ায় সমরজিৎ সাহা। একি সমরজিৎ সাহার সাদা পাঞ্জাবিটা রক্তে রঞ্জিত, বুকের মধ্যে দু’হাতে জাপটে ধরে আছে— ওটা কী?
—কাইয়ুম পাখি। অবশ্য বাড়াদির নতুন এই মানুষেরা এখন আর এই নামে পাখিটাকে কেউ চিনবে না। সবাই চিনবে কালিম পাখি নামে। কায়য়ুম পাখি নামে যারা চিনতো তাদের অনেকেই প্রথমে সাতচল্লিশে, তারপর পয়ষট্টি, একাত্তরে; শেষ বিরানব্বইয়ে বাবরি মসজিদ ভাঙার পরে চলে গেছে কোন খাঁ-খাঁ মুল্লুকে। দু’চার ঘর যারা ছিলো, ধিরে ধিরে ডমেস্টিক মাইগ্রেশন, ঢাকাতে। নিদেনপক্ষে গ্রাম ছেড়ে শহরে। পাখিটার বুকে আততায়ী শিকারীর বন্দুকের বারুদ।
—ইস্। এভাবে কারা যে গুলি ছুড়লো।
—মাংসভুক মানুষেরা।—‘সকল ফুলের কাছে এত মোহময় মনে যাবার পরেও মানুষেরা কিন্তু মাংস রন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। আহা বিনয়! —ও হ্যাঁ সাবিদ, এই হচ্ছে আমাদের সাহাবাড়ির ভিটে। ঐ মাজাভাঙা কাঁঠাল গাছটা দেখছেন, ওখানেই আমাদের কাচারিঘর। আর ঐখানে চার ভিটেতে চার ঘর বাপ-জেঠা-কাকাদের, মাঝখানে বিশাল উঠোন, আমরা কাকাতো-জ্যাঠাতো একুশজন ভাই-বোনই শুধু নয়, আমাদের বড় দাদাদের বাচ্চা-কাচ্চা তো আমার সমবয়সী, ধরেন আরও সাত-আটজন উঠোনে একসাথে খেলেছি। একান্নবর্তী পরিবার। ঐ-তো রান্না ঘর। পাশে কুয়াতলা। ঐ-যে আকাশমনি গাছটা দেখছেন, ওখানে ঠাকুমার হাতে লাগানো বহুবর্ষ পুরনো জবাগাছ। অমন জবা দেখিনি আর কোথাও, এমন লাল! জবাগাছটা নেই। জবাগাছের পাশেই ঠাকুর ঘর। জানেন— আমাদের ঠাকুর গড়তো একজন মুসলমান, আলী কাকা। অনেক বছর পরে একদিন পৌর বাজারের চিপা গলিটার মধ্যে দেখি আলীকাকা বসে হেরিকেন সারছে। আমাকে চিনতে পারলো না। সতীশচন্দ্র সাহার নাম বলার পর অনেকক্ষণ হেরিকেন সারা বন্ধ করে বিমূঢ় কোনো এক অনন্তের দিকে চেয়ে থাকলো, নাহ্— তার ব্যর্থ মাথা নাড়ানো বুঝিয়ে দিলো বাবাকেও চিনতে অপারগ সে। তারপর আবার এক মনে হেরিকেন সারতে লাগলো। শেষদিন পর্যন্তও মানুষের নষ্ট হয়ে যাওয়া হেরিকেন সেরে উনি আলো জ্বালাতে চেষ্টা করছেন। আমাদের বাড়িতে পুজো-পার্বণে যে ঢাকিরা আসতো তারা সবাই মুসলমান, মঙ্গলবাড়িতে গড়াইয়ের পাড় ধরে ওদের বাস ছিলো। বাড়াদির মন্দিরগুলো দিনে দিনে পূজারী ও প্রতিমা শূন্য হলে মঙ্গলবাড়ির ঢাকিরা তাদের পেশা বদল করতে থাকে। কেউ কেউ জেলে-জোলা হলো, কেউ কেউ পৌরবাজারের সবজি বিক্রেতা।
সমরজিৎ সাহা অনেক অনেকক্ষণ তাদের পরিত্যক্ত ভিটেয় দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপ। ভিটে সংলগ্ন বিস্তর জমিজিরেতের বেশির ভাগই নানা সময় বিক্রি হয়ে গেছে, কেবল মূল সাহাবাড়ির ভিটের জায়গাটুকো রয়ে গেছে আজো। পরিত্যক্ত কুয়োটার পাশের প্রাচীন জবা ফুলেরা আজো ঠাকুমার কপালের সিঁদুরের মতোই রক্তিম।
সাবিদ শাহরিয়ারকে নিয়ে এবার বাড়াদির মঠের দিকে সমরজিৎ সাহার গাড়ি এগোতে থাকে। কিন্তু সমরজিৎ সাহার মতো তার গাড়ির চাকারাও আজ যেন খুব স্মৃতিকাতরতায় আক্রান্ত, কিছুটা পথ চলতেই রাস্তার পিচ কামড়ে ধরছে আর তখন গাড়ির গ্লাস নামিয়ে সমরজিৎ সাহা বিগলিত হয়, স্মৃতিতে— ঐ-যে সাবিদ, ঐখানে ছিলো আমার বন্ধু ধনঞ্জয়ের বাড়ি। আর ঐ প্রকাণ্ড ছাতিম গাছটার পেছনে ঐ-তো দীনেশদের টালির ঘর, কী সুন্দর ছিলো বাড়িটা! দীনেশের মা বাড়ির চারদিকে ফুলগাছ লাগিয়ে ভরে ফেলেছিল, কত বিচিত্র সেইসব ফুল! সুপারিগাছকে জড়িয়ে থাকতো বাগানভলিয়া—সব যে কোথায় গেলো! বাড়াদির মঠের সামনের রাস্তায় গাড়ি থামায় সমরজিৎ সাহা, দরজা খুলে সাবিদ শাহরিয়ার নেমেই দূর থেকেই আহা করে ওঠে— কি সুন্দর মঠ! আহা-আহা করতে করতে জঙ্গলাকীর্ণ পথের সিঁথি ধরে এগিয়ে যায় মঠের দিকে। পরিত্যক্ত জীর্ণ জর্জরিত মঠ, বিচিত্র উদ্ভিদে আচ্ছাদিত। কেবল মাত্র মঠের দক্ষিণদিকের প্রবেশ দরজার মুখে মহাকালের স্বাক্ষী হয়ে কিছু অপূর্ব টেরাকোঠা আজও শোভিত। সাবিদ মোবাইলে একটার পর একটা ছবি তুলতে থাকে, ততক্ষণে সাবিদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে সমরজিৎ সাহা। সমরজিৎ সাহা দেখতে পায় অত্যন্ত চিকন একটা ধূসর সাপ মঠের শরীর বেয়ে ভগ্ন চূড়ার দিকে উঠে যাচ্ছে। সাবিদ ছবি তুলতে তুলতে মগ্নমনে বলতে থাকে— এত মূল্যবাণ টেরাকোঠাসমৃদ্ধ মঠটি আজও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর দায়িত্বে নেয়নি, কি আশ্চর্য!
—কেন যে নেয়নি সাবিদ, আমিও ভেবেছি।
—আচ্ছা সমরজিৎদা, এই জমিটা এখন মুসলমানদের মালিকানায়। কিন্তু তারা এই ভগ্ন মঠটি এখনো টিকিয়ে রেখেছে কেন, ভেঙে ফেলেনি যে!
—হয়তো কোনো সংস্কার— বলতে বলতে সমরজিৎ সাহা বালক সমু হয়ে যায় যেন— শৈশবের মতোই লাফ দিয়ে কাঁটাঝোপ অতিক্রম করে মঠের পেছনে যেতেই গাজার গন্ধ আবিষ্কার করে এবং তখন শৈশবের বাসন্তীপূজার প্রাঙ্গনে গজিয়ে ওঠা মসজিদ থেকে শুক্রবারের খুতবার স্বর বাড়াদি গ্রামকে কাঁপাচ্ছে। সাবিদ বলে— দাদা দেখেন। দেখে— জঙ্গলের ভেতরে গুচ্ছ গুচ্ছ বালকদের মাথা ভেসে আছে, তাদের মাথার উপর গাজার ধোঁয়া উড়ছে। সমরজিৎ সাহা গলায় গমক এনে বলে— এই তোরা কারা রে...। বলতেই তাড়া খাওয়া ধূর্ত শেয়ালের মতো জঙ্গলের ভেতর থেকে দলে দলে কৈশোরোত্তীর্ণ ছেলেরা দৌড়ে পালাতে থাকে।— বুঝলেন সাবিদ, এইসব ছেলেদের দাদা-বাবারাই মসজিদে ঈমান ও আমলের খুতবা শুনছে হয়তো, জান্নাতের স্বপ্নে মশগুল হয়তোবা!
সাবিদ আরও আরও ছবি তুলতে থাকে, আর একটা উপড়ে-পড়া প্রকাণ্ড গাছের গুড়িতে বসে সমরজিৎ সাহা জঙ্গলাকীর্ণ সবুজের ঝালর ভেদ করে তাদের মালিকানাহারা চৌদ্দ বিঘার পুকুরের দিকে বনপোড়া মায়ামৃগের মতো তাকিয়ে থাকে—এই শরতের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনেও সে আবিষ্কার করে পুকুরের পাড়টা আসন্ন অপরাহ্নেও কেমন যেন কুয়াশাচ্ছন্ন; সেই কুয়াশা ভেদ করে দলে দলে মানুষ ব্যাগ-পেটরা মাথায় করে, কাঁখে-কোমরে বিচিত্র মাল-সামানা চাপিয়ে নিয়ে আরও গহিন কুয়াশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কুয়াশাচ্ছন্ন অস্পষ্ট মানুষগুলোর হাঁটবার মুদ্রা দেখে সে যেন অনেকটাই ঠাওর করতে পারছে—ঐ-তো দীনেশের মা, কাঁখে বস্তা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে— ঐ-তো হরগোপাল স্যার, লাঠিতে ভর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে— ঐ-তো বন্ধু ধনঞ্জয়, ওর মাথায় বিশাল এক বস্তা; দলবেঁধে যেতে যেতে অস্পষ্ট ধনঞ্জয়ের কুয়াশাবৃত ছায়া দাঁড়িয়ে পড়ে, মাথা থেকে বস্তা নামায়, বস্তার মুখটা খুলে দেয়। সমরজিৎ সাহা দেখতে পায়— সেই বস্তার ভেতর থেকে হাজার হাজার কাইয়ুম পাখির নীল পালক বেরিয়ে উড়তে উড়তে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে।
—মোটামুটি যা যা ছবি তোলা হলো দাদা, এর ভেতর থেকে নিশ্চয় কিছু ডিজাইনের প্যাটার্ন ডেভেলপ করা যাবে। আমরা সেগুলো রেস্টুরেন্টের দেয়ালে, কাউন্টার টেবিলে, হোটেলের আবাসিক কক্ষগুলোতে, এমনকি নিচতলার ফ্রন্টডেস্কে ও লবিতে কাজে লাগাতে পারবো।
সাবিদের কথায় সমরজিৎ সাহার সম্বিত পুনরুদ্ধার হয়— ও হ্যাঁ। বেশ সাবিদ। আপনি নিশ্চয় অসাধারণ কিছুই করবেন।
বাড়াদির মঠের জীর্ণ শরীরের অমূল্য টেরাকোঠার নানা প্যাটার্ন থেকে গবেষণালব্ধ বেশ কিছু ডিজাইন প্রস্তুত করে সাবিদ শাহরিয়ার সমরজিৎ সাহাকে দেখাতে আনে যেদিন, সেদিন আকাশে পূর্ণিমা ছিল; যেনো সেই পূর্ণিমার চাঁদের অনেকটা কাছাকাছি এগিয়ে, সমরজিৎ সাহা তার নির্মানাধীন দালানের সপ্ততলার চূড়ায় বসে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলো— নিজের ও পরিবারের একান্ত ব্যবহারের জন্য সপ্ততলার বিরাট এই কক্ষটির নাম ‘মেঘমল্লার’ না ‘শিবরঞ্জনী’ রাখবে; দু’দিন আগে তার বৃদ্ধাঙ্গুল কামড়ে দেওয়া প্রিয় ম্যাক্স, যদিও অস্ট্রেলিয়ান শেপার্ড বলে ঢাকার কাঁটাবন থেকে কিনে আনার পরে সমরজিৎ সাহার প্রিয় বন্ধু পেট স্পেশালিস্ট অধুনা কমরেড অধ্যাপক কাইজার বলেছিলো—এটা আসলে বেলজিয়ান শেপার্ড; সেই বেলজিয়ান, প্রিয় ম্যাক্সও ধ্যানীর মতো পূর্নিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিলো। পূর্ণিমার আলোয় ধ্যানমগ্নতাচ্যুত হয়ে ম্যাক্স আকস্মিক ডেকে উঠলে সমরজিৎ সাহা পেছনে তাকায়— আরে সাবিদ, আসুন।
আমি জানতাম, নিচের অফিসে আমাকে না পেয়ে আপনি ঠিক উপরে উঠে আসবেন।
—আপনার বৃদ্ধাঙ্গুলের কী অবস্থা, দাদা।
—আসলে আমি তো তর্জনী উঁচু করেই কথা বলেছি সবসময়। ঐ-যে বলতাম ‘ মঞ্চের বক্তব্যের সাথে ব্যক্তিজীবন মিলিয়ে দল গড়ে তুলুন’— সেই তর্জনীই এখন নামিয়ে ফেলেছি, ফলে বৃদ্ধাঙ্গুল এখন আরও ব্রাত্য, তাকে নিয়ে ভাবছি না।
—তবু টিটিনাসের ইনজেকশান নিয়েছেন নিশ্চয়!
—ড. মুকতাদির ভ্যাক্সিন দিচ্ছেন। তিন দিনের কোর্স, আর এক দিন বাকি আছে।
—আপনি রাজনীতি ছেড়ে দিলেন কেন?
— মঞ্চের বক্তব্যের সাথে ব্যক্তিজীবনের সাংঘাতিক অমিল বলে।
—অভিমান! ক্ষোভ...?
—না, ব্যর্থতা। রাজনীতি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। নাও আই এম এ সাকসেসফুল বিজনেসম্যান, গুড হাজব্যান্ড অ্যান্ড ট্রাই টু বি এ গুড ফাদার। বাট আই এম এ রিফিউজি অলঅয়েজ। ঐ-যে দেখছেন দক্ষিণে পূর্নিমার আলোতে ভাসছে আমাদের বাড়াদি গ্রাম, আমাদের অধুনা পাঁচমহলা বাড়ির ভিটে আর ঐ-তো পুবে শহর, নিয়ন আলোর অহঙ্কারে উন্মত্ত— ঐ শহরেও হাতের আঙুল গুনে পাঁটটা বাড়ি দেখানো যাবে সাবিদ আমাদের, ঐ-যে শহরে আমি যে বাড়িটাতে থাকি তার চিলেকোঠা দেখা যাচ্ছে, বাবা বাড়িটা কিনেছিলেন নব্বইয়ের দিকে। এতসব রেখে বাবা কি যেতে চাইতেন! কিন্তু বিরানব্বইয়ের চাপটা বাবা আর নিতে পারেননি। কৃষ্ণনগরের জমি তো বাবা সাতচল্লিশের পরেই কিনেছিলেন। চলে যাবার সময় আমাকে খুব অনুরোধ করেছিলেন—সমু, তোমার এই সব ইমোশনাল অ্যাপ্রোচ ছাড়ো, একা হয়ে পড়বে তুমি। যাইনি, রয়ে গেলাম শহরের ঐ বাড়িটাতে; তবু কোনো বাড়িকেই আমার নিজের বাড়ি মনে হয় না, জানেন। চিরকাল আমি যেনো একটা বাড়ি খুঁজে যাচ্ছি, বাড়ি— একটা দেশ।
—আপনার বাবা-মা ভাইদের সাথে কৃষ্ণনগর চলে গেলেই পারতেন...
—বিরানব্বইতে বাবা ফাইনালি চলে গেলো যখন, তখন আমার হাতে সমাজ বদলে দেয়ার প্রবল ঝাণ্ডা—‘দুনিয়ার মজদুর, এক হও’। চোখে লাল স্বপ্ন; শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে শহরে, ছুটেছি...। কবে কবে আমিও অজস্র ব্রাত্যজনদের স্বপ্নবাজ করে তুলেছিলাম, আমি চলে গেলে মানুষগুলোর চোখ থেকে স্বপ্ন উবে যাবে ভেবে কোথাও পা বাড়াইনি। যদিও স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পর্যবসিত হলো দিনে দিনে। একটা সময় ক্লান্ত ও বিষণ্নতা দখল নিলো মস্তিস্কের— যে কমরেড আমার পকেট থেকে আমার প্রেমিকার চিঠি বের করে ছিঁড়ে ফেলে বলেছিলো— দেয়ালে স্লোগান লেখা শেখো; ক্যাম্পাসের সবচেয়ে সুন্দরী ও মেধাবী ছাত্রীটাকে বিপ্লব শেখাতে শেখাতে সে-ই প্রণয়ান্তর চূড়ান্ত অধিকারে নিয়েছে। মধু ও পূর্নিমা তাদের পর্যাপ্ত হয়েছে; আমার যে প্রিয় নেতারা এখন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউটিভ বা প্রাইভেট ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর, তাদের উজ্জ্বল পায়ের ধুলায়-ই তো আমার যৌবন উঁই খাওয়া কাগজের মতো ব্রাত্য হয়ে আছে। একটা সময় নিজের দিকে যখন তাকালাম, দেখি আমি এক শীতার্ত সাইবেরিয়ান বৃক্ষ, পত্রশূন্য। তবু নিজের ভেতরের লাল সূর্যটাকে মরে যেতে না দিয়ে পথ বদলে নিয়ে পা ফেললাম। মনে হলো কিছু টাকা হলে পুরো সমাজ বদলে দিতে না পারলেও কিছু মানুষের পাশে থাকা যাবে। ঐ-যে স্বপ্নের সম্প্রীতি বিদ্যাপীঠ, সাতজন শিক্ষক, প্রায় দেড়শো ছাত্র-ছাত্রী, তামাকের গুদামে বিশ-বাইশ জন শ্রমিক, রেস্টুরেন্টে পনেরোজন কর্মী— এদের সাথে আছি। এইতো ২০২৪ এর ৫ অগাস্টের পরে ফোনের পরে ফোন আসছে— তুমি ভুল করছো সমরজিৎ, কলকাতা চলে আসো, কানাডা চলে আসো, জার্মানি চলে আসো, সব গুটিয়ে ফেলো সমরজিৎ, ছেলে-মেয়েদের কথা ভাবো, তুমি ভুলে যেও না তোমার নাম সমরজিৎ সাহা।
সমরজিৎ সাহা নিজের নাম কী করে ভুলে যায়! বরং সমরজিৎ সাহা নামটা স্বপ্নের সম্প্রীতি বিদ্যাপীঠ, সাতজন শিক্ষক, প্রায় দেড়শো ছাত্র-ছাত্রী, তামাকের গুদামে বিশ-বাইশ জন শ্রমিক, রেস্টুরেন্টের পনেরোজন কর্মীর পরিপূরক হয়ে উঠেছে দিন দিন এবং নতুন এই নির্মানাধীন দালানে একই সাথে রেস্টুরেন্ট, কমিউনিটি সেন্টার, কনফারেন্স হল ও প্রায় ৪০টি আবাসিক কক্ষ নিয়ে ব্যবসার আরও বিস্তার করলে এখানেও অন্তত আরও ৪০ জন কর্মী সংযুক্ত হবে জীবিকার তাগিদে— এই সমস্ত কিছু নিয়েই তো তার নাম সমরজিৎ সাহা হয় বা হবে।
—কিন্তু সমরজিৎ, তুমি ভুল করেই যাচ্ছো। এমনিতেই তোমার এই নতুন প্রজেক্টটি শহর থেকে একটু ভেতরে, যদিও সামনে দিয়ে হাইওয়ে চলে গেছে, তবুও গ্রামপ্রায়, এতো বিগ ইনভেস্ট; এরপর দেশের এই পরিস্থিতি, ইউটিউবে দেখছো না— রেস্টুরেন্ট, বিনোদন পার্ক গুড়িয়ে দিচ্ছে; এর মধ্যে তুমি হোটেল বিজনেসের কথা ভাবছো কী করে। দেশের ফিফটি পারসেন্ট রেস্টুরেন্ট আবাসিক হোটেল কলাপ্স।— ২০২৪ এর ৫ অগাস্টের পরে কলকাতা চলে যাওয়া কাছের বন্ধু শহরের ধর্নাঢ্য ব্যবসায়ী সুরেশ চাকী ফোন করে নিবৃত্ত করতে চায় সমরজিৎকে। কিন্তু অধুনা কমরেড সমরজিৎ সাহা সমস্ত জুজুর ভয়কে তো রাজনীতির মাঠেই ফেলে এসেছিলো, সে বরং বিরাট নিয়ন সাইন করে নতুন এই প্রজেক্টের নাম ঝুলিয়ে দেয়— ‘নিকেতন’। সে বাড়ি খুঁজেই চলেছে। সুরেশ চাকীকে ফোনের এপার থেকে বলে— শোনো চাকী, হোটেল ম্যানেজমেন্টের ভাষায় একটা কথা আছে— দ্য হোটেল ইজ দ্য ফাস্ট হোম। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ আছে যারা মেন্টালি রিফিউজি। তারা কোনো নির্দিষ্ট বাড়িকে ওন করতে পারে না। প্রশান্তির জন্যে পৃথিবীব্যাপী ছুটে বেড়ায়। এ হোটেল সে হোটেল। কেবল একটা অভিজাত হোটেলে থাকার মুহুর্তগুলোকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করে। আমি এমন কিছু করতে চাই, ঐ মেন্টালি রিফিউজি যারা, লাইক মি, আমার এই হোটেলে এসে যেন তাদের অনুভব হয়— দ্য হোটেল ইজ দ্য ফাস্ট হোম। কিন্তু ডাকসাইটে ব্যবসায়ী সুরেশ চাকী তাকে ছাড়ে না, ফোনের তূণীতে মোক্ষম আঘাতটা করার চেষ্টা করে— সমরজিৎ, তুমি কি তোমার সম্পদের মায়ায় পড়ে যাচ্ছো, তোমার বিঘা বিঘা জমি, বাড়ির পর বাড়ি, দামি গাড়ি, প্রতিষ্টিত একাধিক সফল ব্যবসা, কর্মচারী ঘেরা বাবু সমরজিৎ সাহা...ভাবো, ভাবো সমরজিৎ; তোমার স্বদেশপ্রীতি কুম্ভীরাশ্রু নয়তো, নাকি এ তোমার আরও মুনাফার দৌড়?
সমরজিৎ ভাবে— এই সম্পতি, এই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠা তো তার খুব ইপ্সিত ছিলো না, কখনো; তবুও এই অর্জিত অলঙ্কারসমস্ত দিনে দিনে তাকে কি গূঢ় মায়ায় বেধেছে, নাকি লোভাতুর করেছে আরও প্রবৃদ্ধির শিখরে যেতে— সে ভাবনায় আরও বিপন্ন হয়— রাজনীতির মঞ্চ থেকে তর্জনী নামিয়ে ফেলে ইতস্তত বেকারবৃত্তির ঘুলঘুলিতে ডুবতে থাকলে, তাকে টেনে হিঁচড়ে বড় দাদা জ্যোতিরিন্দ্র সাহা নিজের তামাক ব্যবসায়ে সম্পৃক্ত না করলে এবং দাদা মোক্ষম আস্কারা না দিলে, ধীরে ধীরে দাদার ব্যবসা থেকে নিজেকে উন্নীত করে নিজের স্বতন্ত্র ব্যবসা আরম্ভ করা তার কল্পনাতীত ছিলো। তারপর ক্রমশ ব্যবসায়ে উন্নতি, ব্যবসা থেকে ব্যবসার বিস্তার, কিন্তু সেটাকে আঙুল ফুলে কলাগাছ বলা অসমীচীন। এই ব্যবসায়িক সফলতা হয়েছে দিনে দিনেই, তার অবিরাম একাগ্রতা, পরিশ্রম ও নিষ্টায়। মাঝে মাঝে স্ত্রী ও সন্তানেরা ঘুমিয়ে গেলে বাড়ি যখন নিঝুম হয়, যখন গাড়িবারান্দার গ্রিল বেয়ে দোতলার ঝুলবারান্দায় উঠে আসা মাধবীলতা উন্মাতাল করে তোলে সমরজিতের রাতগুলি অথবা তার প্রিয় কাঠগোলাপেরা এসে তার ঘুমানোর ঘরের জানালায় শিষ দিলে, স্ত্রীর পাশ থেকে উঠে গিয়ে ডাইনিং রুমের বেসিনের আয়নায় সে নিজের দিকে বালকের বিস্ময়েই তাকিয়ে ভাবনায় বিপন্ন হয়— আয়নার সামনে সমু, রক্তে দুরন্ত বালক; যে বালক কেবলই বিষয়, সম্পত্তি ও ব্যবসায়িক সফলতার আঠালো পর্দা ছিড়ে উল্কার মতো গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে যেতে চায়। কোনো কোনোদিন এমনই বালকস্বভাবে তাড়িত হয়ে গভীর রাতে সে একা একা বাড়ি থেকে বের হয়, তার ক্রোড়াধিক মূল্যের গাড়িটি নিয়ে নয়; নিচের গাড়িবারান্দায় সযতনে রাখা বাবা সতীশচন্দ্র সাহার প্রাচীন চাইনাফোনিক্স সাইকেলটা নিয়ে। বারাদি গ্রাম থেকে শহরের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এই সাইকেলে করেই বাবা যেতেন; সমবয়সী অন্যান্য বন্ধুরা যখন উচ্চতর শিক্ষার দৌড়ে সামিল বা উজ্জ্বল কর্পোরেট চাকরির পেছনে অশ্বারোহী, পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া সেই সাইকেলে করেই তখন গ্রামে গ্রামে সমরজিৎ সাহা প্রত্যন্ত কৃষক-শ্রমিকের কানে লাল সালাম দিয়ে বিপ্লবের মন্ত্র গুঁজে দিয়ে আসতো, গ্রামের শিক্ষিত ও স্বল্প শিক্ষিত তরুণদের হাতে দিয়ে আসতো রেড বুক বা মায়াকোভস্কির কবিতা। সাইকেলটা আজও সে যত্ন করে রেখেছে— সাইকেল আজও তার কাছে গতি, প্রত্যক্ষ শ্রমে উৎপাদিত গতি। তার ইচ্ছে পৃথিবীর প্রাচীন কিছু সাইকেলের ফটোগ্রাফ দিয়ে ‘নিকেতনে’র তৃত্বীয় তলায় নতুন রেস্টুরেন্টের একটা দেওয়াল গ্যালারির মতো করে সাজাবে, সেখানে অন্তত চে গুয়েভারার মোটরচালিত সাইকেলের ছবি অবশ্যই থাকবে। সাবিদ শাহরিরয়ার বলে— আইডিয়াটা খুব ভালো, দাদা।
প্রায়শই গভীর রাতে সে একা একা শহরের আনাচে কানাচে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। শহরে ছড়িয়ে থাকা তার পৈত্রিক নানান বাড়িগুলোর সামনে যায় এবং অথর্বের মতো দাঁড়িয়ে বাড়িগুলো দেখে। কোনোটা ভাড়া দেওয়া, কোনোটা পরিত্যক্ত প্রায়— চামচিকার আস্তানা। প্রাচীন সাইকেলটা চালিয়ে সে চলে যায় শহর ছেড়ে বাড়াদি গ্রামে; তেড়ে আসা শহরের অট্টালিকার আলোবহুল বাড়াদিকে যদিও গ্রাম বলা অসমীচীন এখন, তবু গ্রামীণ নৈঃশব্দ্য এখনও মজুদ রয়েছে কিছু। সাইকেল চালাতে চালাতে বাড়াদির ভিটের কাছাকাছি যেতেই যেখানে সাইকেলের চেইন পড়ে যায়, সেখানেই শৈশবে বাড়াদির হাট বসতো। ঐ হাটের পশ্চিমে এখন ঈদগাহের মেম্বর ও মিনার, ওখানে ঐ প্রকাণ্ড তেঁতুলগাছের তলাতেই তো হাওয়াই মিঠাই নিয়ে মলিন ধুতি প’রে হাটবারে বসতো হযরত কাকা, জিহ্বার নিচে দিলে বাতাসের মতো কোথায় উড়ে যেতো সেইসব হাওয়াই মিঠাই আর জিহ্বাটা গোলাপি হয়ে যেতো। বাড়াদির রাতের নৈঃশব্দ্যের ভেতরে তলিয়ে সাইকেলের চেইনটা তোলার চেষ্টা করতে থাকে। কিছুতেই তুলতে পারে না চেইনটা। তখন মৃদ্যু ঝুনঝুনি বাজিয়ে শৈশবের শনপাঁপড়ি বিক্রেতার মতো কাঁধে কাচের বাক্স ঝুলিয়ে একজন অশীতিপর বৃদ্ধ এসে দাঁড়ায় তার পাশে। কাঁধ থেকে কাঁচের বাক্সটা নামিয়ে বৃদ্ধটি বলে— দাও সমু, সাইকেলের চেইনটা তুলে দিই। তোমাকে তো বাড়িটা খুঁজে বের করতেই হবে। পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষের একটা বাড়ি আছে। সেই বাড়িটা খোঁজাই আসলে জীবন।
অশীতিপর বৃদ্ধটি গভীর মগ্নতায় যখন সাইকেলের চেইন তুলে যাচ্ছে, তখন সমু—সমরজিৎ সাহা বৃদ্ধটির কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখা কাঁচের বাক্সটির দিকে তাকায়— না বাক্সটির ভেতর শনপাঁপড়ি নয়, অজস্র জোনাকির আলো ফোয়ারার মতো নাচছে।
—বাক্সের ভেতর এত জোনাকি কেন?
—গ্রাম থেকে ধরে শহরে নিয়ে যাচ্ছি, বিক্রি করবো বলে। শহরের ঐ সমস্ত আলো তো মিথ্যে।
—কারা কিনবে এইসব জোনাকি?
— যাদের আলো হারিয়ে গেছে।
সাইকেলের চেইন তোলা হয়ে গেলে বৃদ্ধটি কাচের বাক্সটি খুলে এক থোকা জোনাকি বের করে সমরজিৎের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে— রাখো, কখনো কাজে লাগবে।
—কিন্তু আমার কাছে তো টাকা নেই এখন।
বৃদ্ধটি হা-হা করে হাসে। এতো বড় ব্যবসায়িক সমরজিৎ সাহা বলছে— টাকা নেই, হাহাহা। তবে যা আছে, দাও।
সমরজিৎ সাহা তার বুকপকেট থেকে অনেকগুলো কাইয়ুম পাখির পালক বের করে জোনাকওয়ালার হাতে দেয়। পালকগুলো জোনাকিওয়ালা তার কাচের বাক্সের ভেতরে রেখে মৃদু ঝুনঝুনি বাজাতে বাজাতে বাড়াদির রাত্রির নৈঃশব্দ্য কেটে পথের বাঁকে মিলিয়ে যায়।
ইদানীং সমরজিৎ সাহার ঘুম হয় না, ঠিক ইনসমনিয়া নয়; আসলে বিছানায় স্ত্রী অমৃতার পাশে শুয়ে ইউটিউবে নানা খবর স্ক্রল করতে করতে রাত ভোর হয় প্রায়শই; একটা খবর থেকে আরেকটা, একশোটা, এক হাজার খবরে। কোনো কোনোদিন ভোর রাতে কিছুটা ঘুম এলেও আকস্মিক ঘুম ভেঙে উঠে বিছানায় হাঁপাতে থাকে। ঘুম ভেঙে যায় অমৃতারও—কী হলো তোমার? বেডটেবিলে থাকা জলের গ্লাস নিয়ে বেভুলের মতো চুক-চুক করে জল খেতে খেতে সমরজিৎ বলে— ওরা, শাহজাদপুরের কাচারীবাড়িটাও ভেঙে দিলো। অমৃতা একটু অসহিষ্ণু হয়— এতো মানসিক চাপ নেওয়ার চেয়ে চলে যাওয়াই তো ভালো। অয়ন্তির স্কুলে গতকাল আলাপ হচ্ছিলো— ঋতু বৌদিরা, আয়াসরা, ডোরথীরা কানাডা চলে যাচ্ছে। তুমি কি তোমার বাচ্চাদের মাদ্রাসায় পড়াবে? আমাদের যা প্রোপার্টি আছে, ছেড়ে দিলে বিদেশে গিয়েও তুমি ব্যবসা করতে পারবে। কিন্তু দলে দলে দেশ ছাড়া তরুণদের মতো বিভুঁইয়ে গিয়ে শেকড় গজিয়ে নেওয়ার মতো বয়স সমরজিৎের নেই, বরং কিছু সম্পত্তি ছেড়ে দিয়ে মেয়েদের দূর দেশে কোথাও পাঠানোর পরিকল্পনা সে করতেই পারে। নতুন প্রজেক্টে যে বিরাট অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে ফেলেছে, সেখান থেকেও পিছু ফেরার বাস্তবতা নেই; বরং সমরজিৎ ভাবে— অন্যান্য ব্যবসাগুলো গুটিয়ে ফেলে ‘নিকেতন’ নিয়েই বাকিটা পথ হাঁটবে সে, গহনে; আর কাঠগোলাপের কথা ভাববে, কায়য়ুম পাখির পালকের কথা ভাববে ‘মেঘমল্লার’ অথবা ‘শিবরঞ্জনী’তে বসে।
বিছানা থেকে নেমে যুদ্ধাহত সৈনিকের মতো বিপন্ন পায়ে হেঁটে গিয়ে সমরজিৎ সাহা মেয়েদের ঘরের ভেজানো দরজা আলতো করে সরায়— মেয়ে দুটো ঘুমাচ্ছে, দুটো পুতুল, দুটো ফুল। আসন্ন ভোরের নরম আলো জানালা দিয়ে চুইয়ে পড়তে চাইছে ওদের মুখে। কিশোরী হয়ে উঠছে তারা, তরুণী হয়ে উঠছে— তাদের নিয়ে কতদিন ঘুরতে বেরনো হয় না সমরজিৎ সাহার, কতদিন...! মেয়েদুটো গাড়ি থেকে নামলেই চারপাশের মানুষ উজবুকের মতো তাকিয়ে থাকে, যেন গাড়ির ভেতর থেকে দুটো চিড়িয়াখানার প্রাণি নেমেছে। অমৃতা খেদ করে বলে— আমাদের বোরকা বানিয়ে দাও।
নতুন প্রোজেক্ট ‘নিকেতন’র কাজ প্রায় শেষ। সপ্ততলার ঘরটির নাম ‘মেঘমল্লার’ অথবা ‘শিবরঞ্জনী’; ঘরটির পাশেই প্রশস্ত ছাদের জায়গা জুড়ে একটা পুল করেছে সমরজিৎ সাহা, মেয়েদের সাঁতারের জন্য। কখনও কখনও জ্যোৎস্না রাতে নিজেও জলে নেমে আশরীর ডুবিয়ে চাঁদের পবিত্রতায় গা ধুয়ে নিতে পারবে।
পুলে প্রথমবারের মতো জল দেওয়া হয়েছে। জলে পা ডুবিয়ে বসে আছে সমরজিৎ সাহা, পাশে ম্যাক্স; আকাশ জুড়ে পূর্ণিমাও। পূর্নিমার আলো ঠিকরে পড়ছে পুলের জলে, যেন অনন্ত রূপালি হ্রদে পা ডুবিয়ে আছে সে। হঠাৎ ম্যাক্স ডেকে উঠলে পেছনে তাকায়— ও, সাবিদ। বলুন প্লিজ।
—ফোর্থ ফ্লোরে নামাজের রুমটা রাখছি আমরা ফাইনালি? তাহলে স্বস্তিপুর মসজিদের ভেতরের কারুকাজের আদলে দেয়ালগুলোর ডিজাইন করবো দাদা। মোঘলদের করা চার-পাঁচশো বছর আগের ডিজাইনের একটা ইম্প্রেশন আসবে তাহলে।
হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ায় সমরজিৎ সাহা। সাবিদ নিচে নেমে গেলে ম্যাক্স কেমন গুটিয়ে বসলো, কংক্রিটের ভাস্কর্যের মতো। দৈত্যকার মেঘের দল দাপিয়ে এসে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া জ্যোৎস্নার প্রবল আলোকে টুটি চেপে ধরছে। সমরজিৎ সাহা তার বুকপকেট থেকে একটা একটা করে কাইয়ুম পাখির পালক বের করে পুলের জলে ভাসিয়ে দিতে থাকে। সমস্ত পুলের জল রাতভর কাইয়ুম পাখির পালকে ভরে উঠতে থাকলে রৌরবান্ধকার মেঘের গ্রাসে পর্যবসিত রাত যদিও সকাল হয়ে আসে, সমরজিৎ সাহা দেখতে পায়—পুলের সমস্ত জল শোনিতপ্রবাহ, আর তার এতোদিনের লালিত কাইয়ুম পাখির নীল পালকগুলো রক্তাভ সেই জলে ভেসে যেন কোন অন্ধকার দরিয়ার দিকে চলেছে।

