গত পর্বে প্রকৃত সৌন্দর্য কী, তা নিয়ে কথা হয়েছে। একমাত্র প্রকৃত শিল্পীই সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বলে, রুচি সমৃদ্ধ কিংবা হৃদয়ে গভীর সংবেদনশীলতা থাকা মানেই শিল্পী হওয়া নয়, সৃজনশীলতা থাকা নয়। রুচিবোধ উন্নত হওয়ায় অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে নিজেকে সৃজনশীল ভেবে বসে, শিল্প কিংবা সৌন্দর্য নির্মাণে হাত দিয়ে ফ্যালে। কিন্তু সৌন্দর্যের মূল চাবিকাঠি যেহেতু তার সম্পূর্ণতা, পরম সুষমার মধ্যেই নিহিত, সেহেতু তার সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার ভেতরে যদি এক বিন্দুও কৃত্তিমতা লুকিয়ে থাকে তাহলে সম্পূর্ণ প্রচেষ্টা পণ্ডশ্রমে পর্যবসিত হবেই। প্রয়াসীর অন্তরে আসবে দুঃখ, ক্রীড়া করবে ব্যর্থতার যন্ত্রণা। এজন্য, নিজেকে শিল্পী হিসেবে ভাবার আগে, শিল্পসৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ করার পূর্বে, নিজের আত্মিক পরিচয় স্পষ্ট করা আবশ্যক। আপনাকে জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন, ‘আমি কি সত্যিই স্বভাবত 'সৃজনশীল', নাকি কেবল সংবেদনশীলতাই আমার পুঁজি?’। রুচি আর সৃজনক্ষমতা তো এক নয়। কান্টও একই কথাই বলেছেন, ‘রুচি হলো সৌন্দর্যকে বোধ বা বিবেচনা করার ক্ষমতা, আর সৃজনক্ষমতা হলো প্রকৃতির সেই স্বভাবজাত প্রতিভা, যার মাধ্যমে মৌলিক কিছু সৃষ্টি করা যায়’ (প.উ.)১

আমি স্বভাবতই সৃজনশীল কি-না, নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সৎভাবে কয়েকটি প্রশ্নের ভেতরেই তার উত্তর লাভ সম্ভব। যেমন, সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় সময়টুকুতে অকারণ আনন্দলাভ হয়? (প্রকৃত সৃজনশীল ব্যক্তির উত্তর 'হ্যাঁ' হবে)। কোনো নান্দনিক ভাবনা কেবল কল্পনাতেই সুখ আনে, নাকি সেই অস্পষ্ট ওই ভাবনাকে কোনো মাধ্যমে রূপ দেওয়ার ব্যাকুলতা ও তাড়না কোনো অর্জনের ইচ্ছে ছাড়াই তৈরি হয়? প্রকৃত সৃজনক্ষমতা কোনো অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ছাড়াই আপনা-আপনিই প্রাণশক্তির ভেতরকার অস্পষ্ট বোধকে বস্তুর দেহে রূপ দেওয়ার তাড়না জোগায়।

প্রকৃত শিল্পী এই তাড়নাকেই কেবল অনুসরণ করে। সে আর কিছু ভাবে না। ওই তাড়নার প্রয়োজনে সে নির্মাণে হাত দেয়। বাসনার সকল আচ্ছাদন খুলে রেখে সে কেবল ওই তাড়নার বশবর্তী হয়। তার কাছে নির্মাণের পর কী হবে তার কোনো ব্যাখ্যা আগে থেকে থাকে না। নির্মাণপ্রক্রিয়ার আনন্দ উপভোগের লোভ তাকে কাঁপায় না। সে অন্ধভাবে, নেশার মতো কেবল ওই প্রবৃত্তির ভেতরেই ডুবে থাকে। সে কেবল শিল্পের প্রয়োজনেই, সৃষ্টির প্রয়োজনেই সৃষ্টির আয়োজন করে।

জগতের সবাই সৃজনশীল নয়, ফলে সবাইই শিল্পী হতে পারে না। সে কারণেই হয়তো জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’।২ শিল্পসৃষ্টির অর্থ হলো মহাজগতের ভেতরকার পরম সুষমা ও শৃঙ্খলতা, প্রকৃতির ব্যকরণের অনুকরণে তার ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি তৈরি করা। জগতের মহাশৃঙ্খলাকে ক্ষুদ্র পরিসরে প্রতিবিম্বিত করার জন্য চাই নিপুণ বুননের হাত, অকৃত্তিম তাড়না। একমাত্র প্রকৃত শিল্পীই তা পারে, প্রকৃত সৃজনক্ষমতার বীজ প্রাণে স্বকীয়ভাবে উৎপাদিত না হলে, শিল্পী হওয়ার যোগ্যতা কখনোই লাভ করা যায় না। কেবল দর্শক হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। জোর করে শিল্পী হওয়ার চেষ্টা করলে বাড়ে কেবল হতাশাই।

আগেই বলেছি, শিল্পের সমঝদার হওয়া, আর শিল্পী হওয়া এক নয়। কিন্তু সৌন্দর্যের প্রতি সংবেদনশীলতা যত নিখুঁত হয়ে ওঠে, বিভ্রান্তিতে পড়ার ঝুঁকি ততই বাড়ে। অবশ্য, ঠিক কখন থেকে শিল্পী হওয়ার চেষ্টা করা উচিত বা ঠিক কখন দর্শক হিসেবে থেমে যাওয়া উচিত, তার সীমারেখা নির্ধারণ করা কঠিন। এ দুইয়ের ভেতরকার সীমারেখা এতই সূক্ষ্ম যে তা খুব সহজেই গুলিয়ে যায়। এই সীমারেখা নির্ধারণ করা কঠিন বলেই, জগতে এতো নকলের ভিড়। কারণ সৃজনশীলতার ভুয়া প্রবৃত্তির ভেতরেই নকলের জন্ম।

সৃষ্টির বিশুদ্ধ তাড়না থেকে যিনি শিল্প নির্মাণ করে, তার প্রথম এবং সর্বোচ্চ আনন্দলাভ লুকিয়ে থাকে নির্মাণ প্রক্রিয়ার ভেতরেই। ভুয়া শিল্পী বা কৃত্রিমভাবে জোর করে হওয়া শিল্পী এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়। তবে শিল্পনির্মাণের ব্যর্থ প্রচেষ্টা মানেই যে খাঁটি সৃজনশীলতার অভাব, তেমন নয়। অনেক সময় বিশুদ্ধ সৃজনবোধও ভুল প্রকাশপদ্ধতির কারণে ব্যর্থ হতে পারে। যেমন, যে বোধের প্রকাশ সুরে হওয়ার কথা ছিল, তাকে ভুলবশত দৃশ্যশিল্পে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা।

তবে শিল্পীর মতো শিল্পের সর্বোচ্চ উপভোগ না অর্জন হলেও দর্শক কিংবা সমঝদারও শিল্পকে উপভোগ করতে পারে, আনন্দের ভাগিদার হতে পারে। কিন্তু তার জন্য চাই বাসনামুক্ত বিশুদ্ধ অনুধ্যান।

কিন্তু কেনই বা শিল্পী সৃষ্টির তাড়না অনুভব করেন? কেনই-বা মানুষের ভেতরে সৃজনক্ষমতার বসবাস, কেন সৃষ্টির প্রেরণা তৈরি করাই তার প্রবৃত্তি? মোরিত্স সে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের প্রাণশক্তি যখন চিন্তাশক্তির সীমার বাইরের কোনো কিছু প্রকাশ করতে চায়, তখন যে হাত দিয়ে ওই প্রচেষ্টায় নামে তাইই সৃজনশক্তি’। (প.উ.)

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের জীবনের অস্তিত্ব, এই বেঁচে থাকা, এই প্রাণ, প্রকৃতঅর্থে আমাদের ভেতরকার রাসায়নিক সামঞ্জস্য ও শৃঙ্খলার উপরে ভিত্তি করেই বিকশিত হয়, টিকে থাকে। তবে ভেতরকার এই রাসায়নিক সামঞ্জস্যকে আদতে মহাজগতের পরম সুষমার, ব্যাকরণের ক্ষুদ্র সংস্করণ হতে হয়। শতভাগ ক্ষুদ্র সংস্করণ না হয়ে উঠলেও, প্রাণ অর্জনের জন্য রাসায়নিক ওই সামঞ্জস্যকে মহাজগতের পরম সুষমার মাপকাঠিতে ন্যূনতম মাত্রা পার করতে হয়। ফলে স্বভাবতই প্রতিটি প্রাণশক্তির ভেতরে অস্পষ্টভাবে হলেও জগতের সমগ্রতা কম-বেশি বীজ আকারে প্রোথিত। তার মাধ্যমেই আমরা কী সুন্দর হবে, আর কী সুন্দর হবে-না, তার অরিয়েন্টেশন লাভ করি। এ কারণে বিকাশের পরই প্রাণশক্তি জগতের মতোই আচরণ করে, নিজের বিস্তার ঘটিয়ে সে নিজেই সমগ্র হয়ে উঠতে চায়। পূর্ণ প্রাণশক্তির স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই হলো নিজের বিস্তার ঘটানো, প্রতিবিম্বিত করার আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষাসমূহ থেকেই সৃজনক্ষমতার উৎপত্তি ঘটে। প্রাণশক্তি যত বেশি শৃঙ্খলা এবং ভারসাম্যের উপর গড়ে ওঠে, তার ভেতর মহাজগতের সুষমার প্রতিচ্ছবি যত বেশি নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত হয়, তার প্রবৃত্তির প্রবলতা ততই প্রগাঢ় হয়, আর ততই সে সৃজনশক্তি উৎপাদন করতে পারে। তবে তার জন্য প্রাণশক্তির ভেতরকার শৃঙ্খলাকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অর্জন করতে হয়। সহজ করে বললে, মহাজগতের শৃঙ্খলা, সুষমার মাপকাটিতে অস্তিত্বের ভেতরকার রাসায়নিক সামঞ্জস্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রা ও অবস্থা লাভ করলে প্রাণের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে, আর ওই ঐক্য একটি নির্দিষ্ট পর্যায় অর্জনের পর প্রাণে সৃজনের প্রবৃত্তি স্ফুরিত হয়।

‘শিল্প হয়ে ওঠার শর্ত হিসেবে ‘নিখুঁত সুষমা’ই’৩ (প.উ.) শেষ কথা না হলেও, কিংবা ‘সৌন্দর্যের মানদণ্ড ইতিহাসজুড়ে পরিবর্তিত’৪(প.উ.) হলেও, জগতের মহাশৃঙ্খলাই যে আমাদের প্রাণের ভেতরের সৃষ্টির তাড়নার মূল উৎস, তা আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

***

পর্ব-১: কখন কোনো কিছু ‘সুন্দর’ অনুভূত হয়?​


তথ্যসূত্র

১. কান্ট, ইমানুয়েল: বিশুদ্ধ যুক্তির সমালোচনা (১৭৮১)

২. দাশ, জীবনানন্দ: কবিতার কথা (১৯৬২)

৩. আডর্নো, থিওডোর: নন্দনতত্ত্ব (১৯৭০)

৪. একো, উমবের্তো: সৌন্দর্য বিষয়ে পশ্চিমা ধারণার ইতিহাস (২০০৪)