ধারাবাহিক দর্শনগদ্য, পর্ব-১
কখন কোনো কিছু ‘সুন্দর’ অনুভূত হয়? এই প্রশ্নের গভীরে যাওয়ার আগে, ‘সুন্দর কী’, সেই প্রশ্নে যাওয়া যাক। মোরিত্স১-এর মতে, ‘জগতের ভেতরকার পরম সুষমা, শৃঙ্খলা বা হারমোনিই হলো সৌন্দর্যের উৎকৃষ্ট ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ধারণা’ (প.উ.)। কিন্তু মানুষের চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি এবং ইন্দ্রিয়শক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে সে তা সম্পূর্ণভাবে বা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। কারণ তার সসীম মানসিক সক্ষমতা জগতের এই অসীম বিশালতা ও অখণ্ড সমগ্রতাকে একসঙ্গে ধারণ করতে অক্ষম। কিন্তু মানুষ তো বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়; সে জগতেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার প্রাণশক্তির গোড়ায় কিংবা চৈতন্যের গভীরেই অবচেতনে জাগতের উৎকৃষ্ট সৌন্দর্যের ধারণার বীজ প্রোথিত, ভালো করে বললে, চৈতন্যই হলো জগতের পরম সুষমার ক্ষুদ্র সংস্করণ। যেহেতু মানুষের বুদ্ধিশক্তি সীমিত, সেহেতু বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সৌন্দর্যকে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ও বিশ্লেষণ করতে না পারলেও, অবচেতনের ওই বোধের মাধ্যমেই কোনো বস্তু বা দৃশ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাকে সুন্দর মনে করবে, আর কাকে অসুন্দর মনে করবে, তার স্বতঃস্ফূর্ত দিকনির্দেশনা পায়।
ধরা যাক, পথে চলতে চলতে একটি ফুল দেখে কেউ থমকে গেল, উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে বলল, ‘কী সুন্দর ফুল!’ কিন্তু এই ফুলকে সে কেন ‘সুন্দর’ বলল, ঠিক কীসের ভিত্তিতে সুন্দর বিষয়ক ওই বোধ তাকে স্পর্শ করলো, সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে চট করে সে তা বলতে পারে না। সে তা স্পষ্ট করে বলতে পারে না, কারণ সে মূলত সুন্দর ও অসুন্দরের অরিয়েন্টেশন বা নান্দনিক শ্রেণীকরণ তার চৈতন্যের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যের ওই আদি বীজের সূক্ষ্ম সংকেতের মাধ্যমে করে।
কিন্তু সে কীভাবে ওই অনবদ্য অরিয়েন্টেশন পায়? আমাদের চোখে কোনো বস্তু বা রূপের 'সুন্দর' হয়ে ওঠার পূর্বশর্ত হলো, জগতের ভেতরকার সৌন্দর্যের যে বিশ্বজনীন ধারণা, তার সঙ্গে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কাঠামোর একটি নিখুঁত সামঞ্জস্য বা ভারসাম্য রক্ষা করা। জগতের আসল সৌন্দর্য কোনো বিচ্ছিন্ন অংশে থাকে না, বরং তা উৎসারিত হয় তার সমগ্র রূপের অভ্যন্তরীণ পরিমিতি ও অনুপাতের হারমোনি থেকে। অর্থাৎ, সৌন্দর্য কোনো টুকরো বা আলাদা অংশে থাকে না, বরং তা তৈরি হয় সবকিছুর সঠিক মিলন ও সামঞ্জস্যে। (যেমন, একটি ফুল পাপড়ির গঠনের কারণেই কেবল সুন্দর হয়ে ওঠে না। তার সামগ্রিক রঙের সামঞ্জস্য, সামগ্রিক গঠন, পরিস্থিতি ইত্যাদির উপরে ভিত্তি করেই সে সুন্দর হয়ে ওঠে।) এই সংহত হারমোনিই হলো সৌন্দর্যের অবয়ব নির্মাণের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাটেরিয়াল বা উপাদান। এখন কোনো বস্তু, সুর বা কাব্যের অবয়বের ভেতরে যদি জগতের ওই মৌলিক হারমোনির একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রূপ নিহিত থাকে বা প্রতিফলিত হয়, তখন আমাদের চৈতন্যে অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য-বোধের ক্ষুদ্র সংস্করণের বিবেচনায় আমরা ইন্দ্রিয়গত বস্তু বা বিষয়কে 'সুন্দর' বলে অভিহিত করি।
তবে সৌন্দর্যে উপলব্ধি ও গভীরতা ব্যক্তির চেতনার পরিধির উপরে ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। কারণ বাইরে থেকে কোনো কিছুকে ইন্দ্রিয়গত হওয়ার পর আমাদের কল্পনাশক্তি এবং চিন্তাশক্তিই তাকে ভেতরে প্রক্রিয়াধীন করে এবং চৈতন্যের সামনে সামনে এনে দাঁড় করায়। কিন্তু সবার ভেতরের এই মানসযন্ত্রগুলো সমান নয়; কারও ইন্দ্রিয়শক্তির প্রখরতা, কল্পনাশক্তির প্রসারতা কিংবা চিন্তাশক্তির সূক্ষ্মতার দক্ষতা যদি কম-বেশি হয়, তাহলে একই বস্তু ইন্দ্রিয়গত করেও তাদের সুন্দর বিষয়ক মন্তব্যের ভেতরেও বড় ধরনের পার্থক্য ঘটে।
কান্টের২ মতে, ‘আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে যা কিছু ইন্দ্রিয়গত করি, বা করেছি, কেবলমাত্র সেসব সংগৃহীত রূপ ও প্রতিচ্ছবির সমন্বয় বা পুনর্গঠন করেই আমাদের কল্পনাশক্তি নতুন কোনো অবয়বের কল্পনা করতে পারে’ (প.উ.)। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি তখনই কেবল একটি 'উড়ন্ত বেগুনি সিংহ'-এর অতিপ্রাকৃত কল্পনা করতে সক্ষম হবে, যখন সে এই সমন্বিত কল্পনার আগে অন্তত একবারের জন্য হলেও পৃথকভাবে ‘উড়ন্ত’ কোনো সত্তা, ‘বেগুনি’ রঙ এবং ‘সিংহ’, এই তিনটি বিষয়ের স্বাধীন ধারণা কোনো না কোনো উপায়ে নিজের ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছে বা অনুধাবন করেছে।
আর ঠিক এখানেই ব্যক্তিমানুষের নান্দনিক স্বাদের মূল বৈচিত্র্য ও পার্থক্য তৈরি হয়। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের জীবনালেখ্য গড়ে ওঠে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক, ভৌগোলিক ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে। ফলে একেক জন একেক বস্তু, রূপ বা দৃশ্যকে একেকভাবে নিজের চেতনায় ইন্দ্রিয়গত করে; স্থান-কালের পার্থক্যে তাদের অভিজ্ঞতার বস্তু ও অনুভূতির তারতম্য ঘটে। এভাবেই বস্তুজগতে একই কিছু বেশি সুন্দর বা কম সুন্দর, এমন সংবেদী তফাত তৈরি হয়। ঠিক সে কারণেই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক পরিবেশের মানুষের ভেতরকার সৌন্দর্যের ধারণায় ও রুচির বহিঃপ্রকাশে এত ভিন্নতা দেখা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাদের অন্তরে সৌন্দর্যের ধারণার মূল যে আদি বীজ নিহিত, তার স্ফুরণ বা অঙ্কুর সবার ভেতরে তখনই প্রায় কাছাকাছি বা সমান সুষমায় ফুটতে পারে, যদি সে নান্দনিকভাবে নিজেকে সমভাবে সচেতন ও শিক্ষিত করে তোলে।
জগতের মহাসৌন্দর্যকে বোধ দিয়ে উপলব্ধি না করতে পারলেও, যা কিছুর ভেতরেই মহাসৌন্দর্য প্রতিফলিত, তা থেকে সৌন্দর্যের উপভোগ অর্জন হতে পারে। তবে যে নির্মাণ করে কেবল সে-ই সৌন্দর্যের সর্বোত্তম উপভোগের দেখা পায়। শিল্যার৩ শিল্পচর্চাকে, বা শিল্পনির্মাণের ক্ষমতাকে মানুষের 'ক্রীড়া-প্রবৃত্তি' বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ‘প্রকৃত শিল্প-নির্মাণ তখনই হয়, যখন মানুষ সমস্ত পার্থিব বাধ্যবাধকতা ভুলে এক পরম স্বাধীন খেলায় মেতে ওঠে’ (প. উ.)। আর ওই ক্রীড়ার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সৌন্দর্যের সর্বোত্তম উপভোগ। যে সময়ে শিল্প গড়ে তোলা হয়, কবি কবিতা রচনা করে, সুরকার সুর বাঁধে, মূলত ওই নির্মাণের প্রক্রিয়া বা ফাংশনের সক্রিয় মুহূর্তটিতেই সৌন্দর্যের সর্বোত্তম উপভোগ লুকিয়ে থাকে। মোরিত্স১ একই কথাই বলেন, ‘নির্মাণের সময়, শিল্প বিকশিত হওয়ার সময়, একমাত্র শিল্পীই সৌন্দর্যের ওই সর্বোত্তম উপভোগের দেখা পান’ (প. উ.)। শোপেনহাওয়্যার এই উপভোগকে মুক্তি হিসেবে দ্যাখেন- ‘পার্থিব অস্তিত্বের নিরন্তর যাতনা ও অন্ধ ইচ্ছা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র আশ্রয় হলো সৌন্দর্যের নিখাদ উপলব্ধি ও শিল্পসৃষ্টির মুহূর্ত’৪ (প. উ.)। শিল্পী নির্মাণের সময় শিল্পী সর্বোত্তম যে উপভোগের দেখা পায়, ঠিক তার দেখা দর্শক পায় না। কারণ শিল্পকর্ম তৈরি হয়ে যাওয়ার পর দর্শক বা শ্রোতা গ্যালারিতে বা বইয়ের পাতায় যা দেখতে পায়, তা আসলে সেই মহত্তম ক্ষণের একটি স্থির প্রতিচ্ছবি বা অনুলিপি মাত্র। তবে পরম না হলেও, তা থেকেও দর্শকের উপভোগ অর্জন হয়।
***
প.উ.: পরোক্ষ উক্তি
টীকা:
১. প্রাক-রোমান্টিক নান্দনিকতাবাদী লেখক কার্ল ফিলিপ মোরিত্স তার ‘সৌন্দর্যের মৌলিক অনুকরণ সম্পর্কে’ (১৭৮৮) গ্রন্থে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন।
২. ইমানুয়েল কান্ট তার ‘বিশুদ্ধ যুক্তির সমালোচনা’ (১৭৮১) গ্রন্থের (Transzendentale Analytik) (অতীন্দ্রিয়গত বিশ্লেষণ) নামক অধ্যায়ে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এখানে তিনি বোধশক্তির বিপরীতে Verstand এবং কল্পনাশক্তির বিপরীতে Einbildungskraft পরিভাষাদ্বয় ব্যবহার করেছেন।
৩. ফ্রীডরিষ শিল্যার। জার্মানির জাতীয় কবি। বিস্তারিত: ‘সরল ও ভাবপ্রবণ কবিতা প্রসঙ্গে’ (১৭৭৫)।
৪. আর্তুর শোপেনহাওয়্যার: ‘প্রবৃত্তি ও প্রতীতির জগৎ’ (১৮১৮)- প্রথম খণ্ড, তৃতীয় পুস্তক।
