জাহাজের দরজাটা বিক্রি করাই এখন একমাত্র অর্থউৎস হয়ে ন্যালাক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো ঘাই দিলে রায়হানের মাথার ভেতরের নিউরনগুলো দল বেঁধে ছুটতে থাকে আঙুরঝুড়ি গ্রামের দিকে।
রাতের বাসেই ঢাকা থেকে দুইশ পঞ্চাশ মাইল দূরের হাইওয়েতে নামল রায়হান। দুপাশে বিষণ্ন ঝিঁঝি ডাকা মাঠ-আঁধারের ঘুলঘুলি পাকিয়ে পড়ে আছে। মাঠের অনির্ণেয় আইলের ওপর ধড়াস ধড়াস পা ফেলে তাদের আঙুরঝুড়ি গ্রাম। বাড়ির উঠোনে মদ্যপের মতো ল্যাংচা করে পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা কুকুরটাই জানিয়ে দিল-বাড়িতে রায়হান এসেছে। এমন ভোর রাতে মা বিচলিত, চৌকিগ্রস্ত প্রাণী প্যারালাইজড বাবা মুখের মধ্যে জড়িয়ে-পেঁচিয়ে যা বলল, ভোররাতের আঁধারের মধ্যে গলিয়ে তা ম্যাদা হয়ে গেল।
ছোটবেলা থেকেই রায়হানের জন্যে বাড়ির যে ঘরটা বাঁধা, সে ঢাকায় পড়তে যাবার পরে তালাবন্ধ থাকে সেই ঘরের জাহাজের দরজা। ছুটিতে আসলে জাহাজের দরজায় ঝুলতে থাকা তালার পাছায় চাবি ঢুকত। এবার অনেক দিন বাদে আকস্মিক বাড়ি এলো সে। মা ঘর খুলে দিল।
দাদির মুখে চাউর হওয়া গল্পটাই এই জাহাজের দরজার ব্যাপারে একমাত্র তথ্য-তোর দাদার সংসারে মতি ছিল না। আমাকে বিয়ে করার একুশ দিনের মাথায় লোকটা উধাও। ফিরে আসল ন’মাস বাদে। মাস সাতেক পরে বান্দা আবার বান্দার পথে। তখন আমার ছ’মাসের পেট। যেদিন সন্ধেবেলায় তোর বাপ আমার পেটেত্তি খালাস হলো, সেদিন সন্ধের ভুরকুট্টি অন্ধকারের ভেতর গরুর গাড়িত্ করে একটা সুন্দর কাঠের দরজা নিয়ে হাজির। বলল-জাহাজের দরজা, আরব সাগরের জাহাজের কেবিনের দরজা। দরজাটার দুই পাল্লায় কাঠ কেটে কেটে দুইখান ময়ূরের ছবি বানানো। এই তো এই ঘরের দরজায় লাগাল। তোর বাপের মুখখান দেখার পর লোকটা আর বাড়ি ছাড়ে নাই কোনোদিন। দেশ-গাঁ থেকে অনেক লোক আসত তার কাছে। খানকা ঘরে বসে রাত-দিন তাদের সঙ্গে বসে ঈমান-আখেরাতের কথাবার্তায় মশগুল থাকত।
চৌকির সঙ্গে গা গলিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে শুয়ে পড়ল রায়হান। ঘুম এলো। চোখের পাতায় গ্লু লাগিয়ে দিল যেন কেউ। গভীর। এর আগেও বহুবার যা হয়েছে আজও আবার সেটাই হলো।-ঘুমের ভেতর গভীর জলরাশির উথাল-পাথাল বোঁ বোঁ শব্দে কান ফেটে যাচ্ছে। বিরাট একটা জাহাজে রায়হান একা, ভাসছে সমুদ্রের ভেতরে। আকাশে কৃষ্ণবদমেঘ। বিদ্যুতের খেমটা। ঝাঁকে ঝাঁকে আলবাট্রস পাখি মাথার ওপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। একটা আলবাট্রস এসে বসল রায়হানের ঘাড়ের ওপর। সমুদ্রের গর্জন থেমে গেল। অদ্ভুত সোনাটা বেজে উঠল জাহাজে।
ঘুম ভেঙে গেছে। কপালে মায়ের হাত-এভাবে হঠাৎ করে এলি, চাকরি-বাকরি কিছুই এখনও থির করতে পারলি নে, না! বিছানায় শুয়ে শুয়ে দিন গুনতে গুনতে তোর বাবা যদি দেখে যেতে পারত, কোনো হিল্যে হয়েছে তোর! কী দরকার ছিল অফিসের বসের গায়ে হাত তোলা। বাজারে এমনিতেই চাকরির আকাল, যা একটা পেলি, খোয়ালি সেটাও।
অফিসের বসের নাকে সজোরে ঘুষি মেরে চাকরিটা হারানোর পরে ঢাকার অজস্র অফিসের দরজায় পা দুটো ছুটে বেড়াল। কোনো দরজাই আর খুলল না। দিনের পর দিন এই অফিসে সাক্ষাৎকার তো ঐ অফিসে পরীক্ষা-নিজের ভেতরে টের পেল, আসলে চাকরি তাকে দিয়ে আর হবে না। পোস্টমাস্টার বাবার পেনসনের টাকা ভেঙে ঢাকার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া শেষ করে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গিয়ে প্যারালাইজড বাবার সামনে বসে বসে বেকারত্বের ল্যাবেঞ্চুশ চোষাও অধমের কাজ।
ঢাকার ফুটপাত, রেলস্টেশনের প্লাটফর্ম, ফার্মগেট-মিরপুরে বন্ধুদের মেসে পিঠ বদলিয়ে চলতে চলতে ছোট হয়ে আসল রায়হানের পৃথিবী। গুলশানের এক অফিসে সাক্ষাৎ শেষে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে গিয়ে একটা জীর্ণ যাত্রী ছাউনির নিচ থেকে পিচ্ছিল কিছু একটা পায়ের নিচে লেগে ধড়াস পড়ে যাচ্ছিল রায়হান। কোনো মতে শরীরের ভারসাম্য সামলে নিলে কী হবে, একটা বিশ্রি গন্ধে ভরে গেল সারা শরীর-এক দলা গু জড়িয়ে গেছে ওর জুতোর তলায়। ফুটপাতের ইটে যতই পা ঘষে ঘষে সেই গু ছাড়ানোর চেষ্টা করে, ততই গন্ধ উৎকট। রায়হানের পিছু নেয় বিশ্রি গুয়ের গন্ধ। হঠাৎ বৃষ্টি নেমে এলো অঝর। বৃষ্টির পানিতে জুতোটা কোন রকম ধুয়ে দৌড়ে গিয়ে ঢুকল ডিআইটি মার্কেটের ভেতর। অসংখ্য চিত্রকর্ম সাজিয়ে দারুণ সব দোকান খুলে বসেছে লোকেরা। অতিমুগ্ধ হয়ে দোকান দোকান ঘুরে অনেক চিত্রকর্ম দেখা হলো তার। অমনি একটা দোকানে ঢুকে দেখল-পুরনো ঘটিবাটি, চামচ, বদনা, ঘড়ি আর অজস্র অ্যান্টিক জিনিসে থই থই করছে চারপাশ। হ্যারিকেনের মতো একটা জিনিস দেখে দোকানের এক কর্মীর কাছ থেকে জানতে পেল-এটা জাহাজের লাইট। একপাশে একটা কাঠের সিন্দুক, বিরল কারুকাজে খচিত। আশ্চর্যভাবে তার চোখে পড়ল একটা পুরনো দরজা। অসম্ভব সুন্দর নকশা করা সারাটা জুড়ে। চোখে বিস্ময় নিয়ে কাছে গিয়ে ছুঁয়ে দেখতে দেখতে দরজার গায়ে লাগানো ট্যাগের দিকে চোখ গেল তার- Price-3,50,000BDT.
বাড়িতে তার ঘরে লাগানো জাহাজের দরজাটার কথা মনে পড়াটাই একমাত্র সিকুয়েন্স ছিল রায়হানের জন্যে সেই সময়।
দৃশ্য-১ : কাঠখোদাই করে ময়ূর আঁকা জাহাজের দরজা বাতাসে দুলছে। আর তার কড় কড় ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ।
দৃশ্য-২ : রাতের অন্ধকারে একটা শাবল চাগিয়ে ঘর থেকে দরজাটা খুলে একটা লরিতে তুলে ঢাকায় আনছে রায়হান।
দৃশ্য-৩ : দোকানের কর্মকর্তার সঙ্গে দাম নিয়ে দরকষাকষি। দোকানের ম্যানেজার বলছে-শুনুন রায়হান ভাই, এসব জিনিস যত পুরনো হয় দাম তত বাড়ে। দরজাটা দেখে যা মনে হচ্ছে একশ বছরের বেশি হবে না। অ্যান্টিক কালেক্টররাও এখন সব বুঝে গেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই কেনে। স্পেশালিস্ট নিয়ে আসে সঙ্গে করে, বুঝলেন।
রায়হানের দৃঢ় বিশ্বাস দরজাটা আরও পুরনো হবে। আরও দাম। গভীর রাতে বাড়িসুদ্ধ ঘুম। পশ্চিমের নিমগাছের পাতারা দল বেঁধে গান গেয়ে চলেছে ঝিরিঝিরি। খানকা ঘরের পাশের মেওয়া গাছ থেকে প্যাঁচার ডাকে সমস্ত বাড়িটা একটা পোড়োবাড়ির রাতে পালটে গেছে। ঘরের পেছনে বাঁশঝাড়ে ঘেরা পুকুরের শান্ত জলে ঘাই মেরে আবার হয়তো ঘুমিয়ে গেল কোন প্রাচীন বোয়াল। দরজাটা খোলা হয়ে গেছে রায়হানের। বাবা একটু যেন কঁকিয়ে উঠল-সেই মৃদু শব্দ শুনতে পেল। দরজাটা কাঁধে করে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে উঠোন পার হয়ে মাঠের আইলে পৌঁছে যায়। চৈত্রমাসের খড়খড়ে মাঠ। বড় বড় মাটির ঢেলা গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে দরজার পাটাতনের আঘাতে। কখনো আইল, কখনো মাঠের চৌচিরতাকে আরও আঘাত দিয়ে দু’কিলো দূরের হাইওয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে রায়হান।
চৈত্রসংক্রান্তির রাত। এতক্ষণ কিছুই টের পায়নি সে। মেঘের শাসনে উপনিবেশ হয়ে ছিল চৈত্রসংক্রান্তির জ্যোৎস্না। এখন অন্ধকারের ব্যারিকেড ভেঙে ডাকাত-ধবল আলো ময়ময় করে দিল চৈত্রের চৌচির মাঠ। ক্লান্ত হয়ে পড়েছে রায়হান। খুব ক্লান্ত। শরীরে আবার একটু জোর নিয়ে ঢালু বেয়ে উঁচু হাইওয়েতে উঠে দাঁড়াল দরজাটা নিয়ে।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। তেমন গাড়ি নেই হাইওয়েতে আজ। বেশকিছু সময় পরে গো গো করতে করতে একটা ট্রাক। হাত নাড়াতেই থেমে গেল। গাড়ির হেলপার তড়িৎ নেমে দুজনে মিলে ধরে দরজাটা ট্রাকের ডালার ভেতরে। সঙ্গে রায়হানও। গো গো করে গাড়ি ছুটল, ঢাকার দিকে। আকাশের দিকে ঘাড় উঁচিয়ে ধরতে রায়হান দেখল-আঙুরঝুড়ি গ্রামের চৈত্রসংক্রান্তির জ্যোৎস্না পিছু নিয়েছে তার। ভোর হতে হতেই ডিআইটি মার্কেটের সামনে দরজাটাসহ আনলোড হয়ে গেল সে। অ্যান্টিকের দোকানের সামনের একটা কংক্রিটের দেয়ালে দরজাটা হেলিয়ে রেখে ঘুমক্লান্ত হলো।
রোদ উঠে গেছে শহরে। চকচকে রোদ। কিন্তু অভিজাত এ এলাকার দোকানপাট বেলা এগারোটার আগে খোলে না। এ এলাকার মানুষেরা নিশাচর। ঠিক বেলা এগারোটা করে অ্যান্টিক গ্যালারির কর্মচারী রবিউল এসে দোকানের তালার চাবি ঢুকিয়ে দিল। ম্যানেজার আসতে আরও আধঘণ্টা।-ও, আপনি দরজাটা নিয়ে এসেছেন। একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস আর ছোট পিতলের হাতুড়ি নিয়ে উলটে-ভেজে যাচাই করে নিল ম্যানেজার সাহেব।-না, রায়হান ভাই, দাম বেশি দিতে পারব না আমরা। দিস ইজ নট ফিফটি ইয়ার্স এজড। ইউ ক্যান গেট ফিফটি থাউজেন্ড অনলি।
রায়হান নিজের ভেতরে বাঘের মতো ঘো ঘো করে ওঠে। আমার বাবার বয়স সিক্সটি ফাইভ। দাদি বলেছিল-বাবার যেদিন জন্ম, সেদিনই এই দরজাটা বাড়িতে নিয়ে আসে দাদাজান। তাছাড়া এটাতো অনেক বছরের পুরনো একটা জাহাজের দরজা। অনেক বছরের পুরনো মাল।
পাশাপাশি আরও কিছু অ্যান্টিকের দোকান। দরজাটা কাঁধে বয়ে নিয়ে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত, পেটে ক্ষুধা-মাথাটা শরীর থেকে ভেঙে পড়তে চাইছে। ট্রিভোলি অ্যান্টিকের ম্যানেজার এনায়েত বললেন-দরজাটা আমাদের গ্যালারিতে রেখে যান। আমাদের এক বায়ার আসার কথা দু-একদিনের মধ্যে। আমরা দাম হাঁকাব। যা হবে ফিফটিন পারসেন্ট আমাদের, বাকিটা আপনার। আমরা লিগ্যালি ডকুমেন্ট দেখাব, চালান-ভাউচার।
রায়হান আশ্বস্ত হলো না। দরজাটা কাঁধে করে নিয়ে পাঁচতারকা খচিত হোটলের সামনে দাঁড়িয়ে চাকরির জন্যে অজস্র অফিসের দরজা থেকে বেদনার্ত হয়ে ফিরে আসা রায়হান হকার হয়ে হাঁক দিতে থাকে-এই দরজা কিনবেন, দরজা। এই দরজা বদলে দেবে আপনার ভাগ্যের দরজা। এই দরজা যেই ঘরে লাগাবেন, সেই ঘর হবে বেহেশতের ঘর। আরব সাগরের জাহাজের দরজা ভাই, সুন্নতি দরজা।
ঢাকার পথচারীদের কাছে এমন হকার নতুন। টগবগে যুবক ছেলেটা পাগল হয়ে গেছে-কারও কারও সহানুভূতি, কারও কারও খুচরো হাসির খোরাক। দরজা নেবেন, দরজা কিনবেন-এভাবে সন্ধে, এভাবে রাত। রায়হানের পাশ দিয়ে দামি দামি গাড়ি সাঁই সাঁই করে এসে থামছে ওয়েস্টিন হোটেলের গেটে। ঝলমল করতে করতে খলবলাতে খলবলাতে ঝা চকচকে নারী-পুরুষ ঢুকছে হোটেলের ভেতরে। কালো মার্কারি গ্লাসে ঢাকা হোটেলের জানালা ভেদ করে কোনো আলোই বাইরে আসছে না।
মাঝরাতের ঢাকার রাস্তার ঘুম ভেঙে যাবে বলে কয়েকটা প্রাইভেট কার প্রায় নিঃশব্দে এদিক ওদিক চলে যাচ্ছে, তখন রায়হানের চোখে ঘুম।-একটা দেয়ালে দরজাটা হেলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমের ভেতরে সমুদ্রের বিরাট গর্জন। বিরাট সমুদ্রের মধ্যে একটা মস্ত জাহাজে রায়হান একা। মাথার ওপর অজস্র আলবাট্রস পাখি। একটা আলবাট্রস রায়হানের কাঁধের ওপর এসে মরে গেল। ঘুমটা খসে পড়ল চোখ থেকে। একজন উটকো সাজগোজ করা যুবতী রায়হানের শরীরে হাত দিয়ে ওকে জাগাল।-এই সুন্দর ছেলে, ওঠো, তোমার সঙ্গে প্রেম করব।
রায়হান উঠে দাঁড়াল। দরজার একপাশ ধরল যুবতী, আর পাশ রায়হান। দুজনে দরজাটা দাঁড় করাল। যুবতী বলল-চলো ঢুকে পড়ি, এটাই আমাদের ঘর, দরজা আটকে দাও।
কাঠখোদাই করা ময়ূর আঁকা জাহাজের দরজার পাল্লা ভিড়িয়ে দিল রায়হান। সারা ঢাকার শহরের রাত একটা বিরাট ঘরে বন্দি হয়ে গেল। হাজার হাজার মার্কারি আলোর রোশনাইতে ঝলমল করছে বিরাট দুনিয়া। বিরাট এ আলোর দুনিয়ার দরজাটা আটকানো, কিন্তু কোনো দেয়াল নেই। সারি সারি ন্যাংটা মানুষ আর বিকট শীৎকার চারপাশে। এদিক-সেদিক দেখতে গিয়ে যুবতীকে হারিয়ে ফেলল রায়হান। মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেল। অস্থির হয়ে উঠল। সংগমের আঠায় ল্যাজবেজে হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর মুখে হাত দিয়ে দিয়ে যুবতীকে খুঁজল। না-কোথাও যুবতীটি নেই। এখানে সবাই সমকামী। বুকে সিলিকন ব্রেস্ট লাগিয়ে হিজরারা উল্লাস করছে। তাদের করুণ শীৎকার মুখ থুবড়ে পড়ছে চারদিকে।




